RFL

লুকানো ডায়েরি থেকে- ৮

0

চেনা অপরিচিতা: একটা নির্দিষ্ট বয়সের পর যখন কেউ গৃহত্যাগ করে তখন তার জন্য অন্য পরিবেশে মানিয়ে চলা একটু কঠিন। বিশেষ করে একটা মেয়ে যে তার সারাজীবন মায়ের পাশে দুইদিকে দুইটা কোল বালিশ দিয়ে ঘুমাতো, যে মায়ের পেটে হাত দিয়ে সারা বাড়ি ঘুরতো, মায়ের সাথে খুনসুটিতে মায়ের দেহের বিভিন্ন অংশকে বাস্তবিকভাবেই সন্তান জ্ঞান করতো, যার বিশাল একটা লাইব্রেরি ছিল, যার সময়ের সাথে পোক্ত একটা নির্দিষ্ট জীবনাচরণ ছিল, সে যখন একটা পাতলা শাল নিয়ে কনকনে ঠাণ্ডায় বাড়ি ছাড়ে, তার ভেতরের খবরটুকু কাউকে বোঝানো সম্ভব নয়।

কোন পরিস্থিতিতে আমার বয়সী একটা মেয়ে নিজের স্বস্তির জায়গা ছেড়ে পালিয়ে যায় সেটা যারা আমার বিগত লেখাগুলো পড়েছেন তারা অবগত আছেন। এটাকে আমি বাড়াবাড়ি কখনই মনে করি না। বরং এই অবস্থাকে দেওয়ালে পিঠ ঠেকে যাওয়ার অবস্থা থেকে পরিত্রাণের একটা অন্তিম চেষ্টা হিসেবে দেখেছি।

সে যাই হোক। ভাইয়ার বাসায় তো এলাম। কিন্তু ভাইয়া আমার থাকার জন্য তার রুম ছেড়ে দিয়ে আমাদের বাসায় থাকতে চলে গেল। ঘূণাক্ষরেও আমার অবস্থানের কথা আমার ভাই জানায়নি। আমার মনে হয় কারণটা আপনারা বুঝতে পারছেন।

ভাইয়া তো নেই। খাবো কী? নিচে একটা রান্নাঘর আছে, কিন্তু একা একা নিচে যেতে ইচ্ছে হয় না। ফ্রিজে একটা রান্না করা মুরগির টুকরো ছিল। সেটা এমনিতেই বাসি ছিল। তিনদিন কোনমতে খেলাম, কিন্তু চতুর্থ দিন পারলাম না। ফেলে দিতে হলো। আমার মনে আছে, আমার পছন্দের মানুষটি মাঝে মাঝে অফিস থেকে ফিরে আমার কাছে ছুটে আসতো গরম ভাত আর মুরগির টাটকা কারি নিজ হাতে রান্না করে। বসে আমাকে খাওয়াত। আমি খেতাম আর ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদতাম।  কাঁদতাম, অনেকদিন পর যত্ন করে কেউ খাওয়াচ্ছে, কাঁদতাম, মায়ের কথা মনে পড়ায়।

ভাইয়ার বাসা লেকের পাড়ে ছিল। খুব ঠাণ্ডা পড়তো। রাতে গায়ে দেওয়ার মতো গরম কিছু ছিল না। আমি বিছানার তোষকের নিচে ঢুকে পরতাম, তবু শীত মানতো না। আমাকে যারা চেনে, তারা আমার সহ্য ও ধৈর্য্য শক্তি সম্পর্কে জানেন। আমি ঠাণ্ডা সহ্য করতাম। শেষের দিকে এই ঠাণ্ডা ব্যাপারটা খুব ঘেন্না লাগতো। তখন যাকে ভালবাসি সে ব্যাপারটা জানতে পেরে আমাকে গরম পোশাক কিনে দেয়।

খবর পাই, বাসা থেকে আঁচ করতে পেরেছে আমি ভাইয়ের কাছে। কিন্তু তাদের ইগো এতটাই উচ্চমার্গীয় যে তারা আমাকে আনতে আমার খালা-খালুকে বলে। কেউ অবশ্য আসেনি। ভাইয়ার সাথে কথাসাপেক্ষে আমরা বিয়ের ডেট এগিয়ে আনি। দু’জন মিলে শপিং করি বিয়ের। শাড়ী চিনি না, স্বর্ণের ক্যারেট বুঝি না। আন্দাজে যেটা ভাল লাগে, কিনি। বিয়ের আগের দিন আমার পক্ষের তেমন কেউ নাই দেখে এক বন্ধূকে ওর অফিস থেকে তুলি।

বিয়ের দিন বিকেলে পারলারে গিয়ে বললাম, আমার আকদ হবে, খুব সাধারণ পার্টি মেকাপ করে দিতে। ওরা সাজাতে গিয়ে হুলুস্থুল করে ফেললো। সাজটা বড্ড বেশি সুন্দর হয়ে গেছিলো। ওরা আরও সাজাতে চেয়েছিল, শাড়ী, চুল এসব ঠিক করে দিতে চেয়েছিল। আমি পালিয়ে বেঁচেছি। ভীষণ লজ্জা হচ্ছিল।

বাসায় গিয়ে দেখি বাসার কেয়ারটেকার ঝলমলে বাতিতে বাগান সাজিয়েছে। আমি নিজে নিজে বিয়ের শাড়িটা পরলাম। পরতে গিয়ে পুরো নাকানি-চুবানি অবস্থা। খোঁপায় ফুল আটকাতে গিয়ে, ঘোমটা দিতে গিয়ে খুব অসহায় লাগছিল। কিন্তু, সবটাই আমি দেখছিলাম একটা বিশাল কাজের অংশ হিসেবে। মনে হচ্ছিল, কাজটা শেষ হলে বাঁচি।

আমার হবু বড় যখন গাড়িতে করে তার আত্মীয়-স্বজন নিয়ে বাড়ির সামনে এলো, তখন সে নিজে নেমেই গাড়ি পার্কিংয়ে এ সাহায্য করলো সবাইকে।

ভাইয়ার এক বন্ধু আমার উকিল বাবা হলো। আমাকে যখন আলহামদুলিল্লাহ বলতে বলা হ’লো আমি বিনা সঙ্কোচে তা উচ্চারণ করলাম। মনে হলো একটা বিশাল ভার বুক থেকে নেমে গেল।

(চলবে…)

লেখাটি ১,৪৪২ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

RFL
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.