RFL

এই যুগের সীতা পাঠ (পর্ব ২)

0

ফারজানা আকসা জহুরা: আনুমানিক তিন হাজার খ্রিষ্ট পূর্বাব্দে বেদব্যাস রচিত মহাকাব্য “মহাভারত” এর অন্যতম শক্তিশালী ও কেন্দ্রীয় চরিত্রটি হলো “দ্রৌপদী”। অগ্নিকন্যা দ্রৌপদী, যিনি ছিলেন পূর্বজন্মে সীতা। সেই সীতা, যিনি আমাদের সমাজে নারীর আদর্শ। অথচ এই সীতাই পরের জন্মে দ্রৌপদী হয়েছিলেন। যাকে ধৃষ্টরাষ্ট্রের রাজ্য সভায় শুনতে হয়েছিল ‘বেশ্যা’।

পতিভক্ত সীতা, যিনি কিনা বনবাসে গিয়েও রামের মূর্তি বানিয়ে পূজো করে গিয়েছেন, সেই সীতার সতীত্ব পরীক্ষায় রাম পুনরায় সকলের সামনে অগ্নিপরীক্ষা দিতে বলেছিলেন। অপমানে- ক্রোধে সীতা মাতা ধরিত্রীকে আহ্বান করে পাতালে চলে যান।  স্বামীর অগ্নিপরীক্ষায় তিক্ত-বিরক্ত সীতা, তার ভুল বুঝতে পেরেছিলেন, তাই তো তিনি আর পতি পূজা না করে শিবের পূজায় ব্যস্ত ছিলেন।

যৌন মর্ষকাম, বাংলাদেশ ও ভারতশুধু কী তাই, নলজানি হয়ে তিনি আর রামের মতোন বর চাননি, চেয়েছিলেন ১৪ গুণসম্পন্ন স্বামী l অগ্নিকন্যা দ্রৌপদীর পঞ্চ স্বামী ছিলো শিবের সেই আশীর্বাদ। শিবের দেয়া এই আশীর্বাদের কারণেই দ্রৌপদীকে শুনতে হয়েছিল ‘বেশ্যা’।

আজ যখন কোনো নারী প্রথম সংসারে অসুখী হয়ে তালাক দিয়ে একা থকতে চায়, কিংবা দ্বিতীয়বার সংসার শুরু করতে চায়, তখনও কিন্তু তাকে দ্রৌপদীর মতনই শুনতে হয়, “তুই একটা বেশ্যা”। এখনও আমাদের সমাজ নারীর দ্বিতীয় বিয়েকে মেনে নিতে পারে না। আবার অনেক নারীই এখনও সীতার মতন একাকি জীবন সহ্য করতে পারে না। জীবনভর নারীদের সীতার মতন অগ্নি পরীক্ষা দিতে হয়, শুনতে হয় কটু কথা। তাই তো কটু কথার আগুনে পুড়ে পুড়ে একদা সীতা হয়ে ওঠে দ্রৌপদী। দ্রৌপদী জন্মও যে আগুনে পুড়ে, তাই নয় কি? 

পাঞ্চাল রাজা দ্রুপদের প্রতিশোধ যজ্ঞে জন্ম হয় দ্রৌপদীর। তার জন্মলগ্নে দৈববাণী হয় যে, তার দ্বারা কুরুবংশ ধ্বংস হবে। তবুও দ্রুপদ কন্যা বলে দ্রৌপদীকে গ্রহণ করতে চায়নি, ভেবেছিলেন এই কন্যা দিয়ে তিনি কী করবেন? কেমনেই বা এই কন্যা কুরুবংশ ধ্বংস করবে?  

হাজার বছর পর, আজও অনেক পরিবার কন্যাশিশুকে মেনে নিতে চায় না! ভাবে এই কন্যা যদি তার পরিবারের কলঙ্কের কারণ হয়? তাই তো এই সমাজের কন্যাদের পদে পদে প্রমাণ করতে হয় যে, ” সে ভালো মেয়ে …. সীতার মতোন পবিত্র”। কখনও বা প্রমাণ করতে হয় যে, “সে তার ভায়ের মতনই শিক্ষায়-দীক্ষায় ভালো”। ঠিক তেমনি, যেমন হাজার বছর পূর্বে  দ্রৌপদীকে প্রমাণ করতে হয়েছিল যে, “সে তার ভাই ধৃষ্টদ্যুম্ন থেকে অধিক ভালো যোদ্ধা ও পিতার জীবন রক্ষায় সক্ষম”।

দেবরুপিনী কন্যা দ্রৌপদী ছিলেন একাধারে “দেব … দানব … যক্ষেরও আকাঙ্ক্ষিত”। আর এই কারণে দ্রৌপদীর স্বয়ম্বরে জয়লাভে ব্যর্থ দুর্যোধন, ইন্দ্রপ্রস্থ সমৃদ্ধে হিংসার আগুনে দগ্ধ হয়ে দ্যুতক্রীড়ায় পাঁচ পাণ্ডবকে পরাজিত করে ইন্দ্রপ্রস্থের রানী দ্রৌপদীকে তার দাসী বানাতে চেয়েছিল, চেয়েছিল দ্রৌপদীকে লাঞ্ছিত করতে। প্রতিবাদী দ্রৌপদী তা মানতে অস্বীকার করলে দুঃশাসন চুলের মুঠি ধরে নিয়ে আসে। দ্রৌপদী তখনও দুর্যোধনের দাসী হতে অস্বীকৃতি জানালে দুর্যোধন তার ভাই দুঃশাসনকে আদেশ দেয় দ্রৌপদীর বস্ত্র হরণ করতে।

হস্তিনাপুরের সেই রাজ্য সভায় সুতপুত্র কর্ণ, যিনি দ্রৌপদীর স্বয়ম্বর অনুষ্ঠানে সুতপুত্র বলে দ্রৌপদীর দ্বারা প্রত্যাখ্যাত হয়েছিলেন, হয়েছিলেন অপমানিত।  সেই কর্ণ সুযোগ বুঝে দ্রৌপদির পঞ্চস্বামী নিয়ে প্রশ্ন তুলেন। বলেন, “এক স্বামীই যেহেতু বেদবিহিত, আর দ্রৌপদীর অনেক স্বামী, তাই তিনি বেশ্যা”। আর এইভাবে ধর্মের দোহাই দিয়ে ধৃতরাষ্ট্রের রাজ্য সভায় দ্রৌপদীর বস্ত্রহরণ বৈধতা পায়।

আমাদের এই পুরুষ শাসিত সমাজ কখনও নারীর প্রত্যাখ্যান মেনে নিতে পারে না। যখনই কোনো নারী প্রেম বা বিয়েতে নিজের মতামত দেয়, কিংবা কাউকে প্রত্যাখ্যান করে তখনই তার চরিত্র নিয়ে টানাটানি শুরু হয়ে যায়। যারা প্রত্যাখ্যাত হয়, কেন জানি তারা ঐ নারীটিকে বেশ্যা বা চরিত্রহীন প্রমাণে ব্যস্ত থাকে। কখনো বা তারা নারীটির মুখে এ্যাসিড ছুঁড়ে মারে, কখনও ধর্ষণ, কখনও বা চাপাতির কোপে তাকে ক্ষতবিক্ষত করে। দানবীর খ্যাত কর্ণও সেই একই কাজটি করেছিলেন।

ধৃতরাষ্ট্রের সেই রাজ্য সভায় এতোকিছু করেও তারা দমাতে পারেনি দ্রৌপদীকে, পারেনি তার অসম্মান করতে। দ্রৌপদী তো কারোর সামনে মাথা নত করেনইনি, বরং তাদের অন্যায়ের বিরুদ্ধে একাই প্রতিবাদ করেছিলেন। তিনি বার বার তার বিজিত হওয়ার প্রশ্ন তুলেছিলেন, বলেছিলেন, “তিনি তার স্বামীদের সম্পত্তি নন…তিনি আলাদা মানবসত্ত্বা, আর তাই তার অনুমতি ছাড়া তাকে বাজি রাখা যায় না। দ্রৌপদীর এই আত্মবিশ্বাস ও তার প্রতিবাদী রূপই ছিল দেবতাদের কাছে খুব প্রিয়। তাই তো সেদিন দেবতারা দ্রৌপদীর কোনো অসম্মান হতে দেননি, স্বয়ং অদৃশ্য হয়ে বস্ত্ররূপে দ্রৌপদীকে আবৃত করেছিল। শুধু কী তাই, সেই দিনের সেই অন্যায় ও অপমানের বিরুদ্ধে দ্রৌপদীর নেয়া আত্মপ্রত্যয় দেবতাদের বাধ্য করেছিলো কুরুক্ষেত্র প্রস্তুত করতে।

ধর্মের দোহাই দিয়ে দ্রৌপ্রদীর সাথে যে অধর্ম হয়েছিল, তারই ফল ছিলো মহাভারত। যেই ধর্মযুদ্ধে নারীর সাথে ঘটে যাওয়া অন্যায় ও স্ত্রীর সাথে হওয়া অপমানের শাস্তি দিতে ভীম তার একশত ভাইকে নিজ হাতে হত্যা করেছিল। করেছিল তার ভাই দুঃশাসনের বুক চিরে রক্তপান।

সম্ভবতঃ ভীমই প্রথম কাল্পনিক চরিত্র, যে বৌয়ের সম্মানের জন্য ভাইকে ত্যাগ করেছিলেন। এর পূর্বে ও পরে বিভিন্ন কাব্যে বরং মায়ের জন্য, ভায়ের জন্য, বৌ ত্যাগের কথাই বলা হয়েছে। শুধু ভীম না, এই ধর্মযুদ্ধে নিজ সহোদর কর্ণকে অসহায় অবস্থায়  হত্যা করেছিল অর্জুন। ধর্মপুত্র যুধিষ্ঠির ধর্মের বিরুদ্ধে গিয়ে ছলনার আশ্রয় নেয়। সত্যবাদী যুধিষ্ঠিরের মিথ্যা কথায় গুরু দ্রোণাচার্য অস্ত্রত্যাগ করলে দ্রৌপদীর ভাই ধৃষ্টদ্যুম্ন নির্মমভাবে হত্যা করেছিল তাকে। আর অর্জুন শিখণ্ডীকে সাথে রেখে নিরস্ত্র প্রাণপ্রিয় পিতামহ গঙ্গাপুত্র ভীষ্মের ওপর ক্রমাগত বাণবর্ষণ করতে থাকেন।

“শিখণ্ডী” ছিল ভীষ্মের একটি পাপের শাস্তি। যে কিনা পূর্বেজন্মে ছিল কাশী রাজার কন্যা “অম্বা”। যাকে ও তার বাকি দুই বোনকে ভীষ্ম তার অযোগ্য বৈমাত্রেয় ভাই “বিচিত্রবীর্যের” সাথে বিয়ে দেওয়ার জন্য স্বয়ম্ভর সভা থেকে জয় করে নিয়ে আসেন।  কিন্তু ভীষণ প্রতিজ্ঞাবদ্ধ ভীষ্ম নিজে অম্বাকে গ্রহণ করতে পারেননি। আর তাই তো তার প্রতিশোধ নিতেই অম্বার দ্বিতীয় জন্ম “শিখণ্ডী” যুদ্ধে উপস্থিত ছিলেন। কোনো নারীর বিরুদ্ধে অস্ত্রধারণ ছিল ভীষ্মের নীতি বিরুদ্ধ কাজ। আর তাই পরাক্রমশালী ভীষ্ম অর্জুনের বাণ দ্বারা শয্যায় শায়িত হয় ও তার পতন ঘটে।

হতে পারে বেদব্যাস রচিত মহাভারত একটি কাল্পনিক কাহিনী। কিন্তু আসলেই কি কাল্পনিক? এর সাথে কি বাস্তবতার কোন মিল নেই?

ফারজানা আকসা জহুরা

আজও তো আমরা এই সমাজে দুর্যোধন আর দুঃশাসনদের দেখতে পাই। কখনো পহেলা বৈশাখের ভীড়ে তারা দ্রৌপদীদের বস্ত্র হরণ করে, কখনও বা সেনানিবাসে নারীকে বিবস্ত্র ও ধর্ষণ করে, কখনো হত্যাl  কখনো বা কলেজ ক্যাম্পাসে কুপিয়ে মৃত্যুর দুয়ারে নিয়ে যায়। তবুও তারাই এই সমাজে সগর্ব বসবাস করে, সদর্পে ঘুরে বেড়ায়। এই যুগেও ঘায়েল দ্রৌপদীদের চরিত্র নিয়ে প্রশ্ন ওঠে! তাদের ‘বেশ্যা’ বলা হয়! তাই বেশ্যাদের সাথে ঘটে যাওয়া অন্যায়গুলি সমাজপতিদের মনকে নাড়া দেয় নাl

আমাদের এই সমাজ দেখে না দ্রৌপদীর ভেতর লুকিয়ে থাকা সীতাকে, দেখে না দ্রৌপদীর মনের পবিত্রতাকে। ধর্মের দোহাই দিয় আজও অধর্ম হয়। আজও ধর্মের নামে নারীকে শোষণ করা হয়, করা হয় অত্যাচার। আজও সত্যবাদী যুধিষ্ঠির দ্যুতক্রীড়ায় পরাজিত হয়ে মৃত স্ত্রীর চরিত্র হরণ দেখে। অন্ধ রাজা ধৃতরাষ্ট্রের পুত্র হওয়ার গৌরব ও সুবিধা সবই ভোগ করে দুর্যোধন আর দুঃশাসনেরা। ইচ্ছে হলে তারা বিশ্বজিতরে কোপায়, ইচ্ছে হলে খাদিজারে কোপায় … ইচ্ছে হলে তারা দ্রৌপদী তথা তনুদের বিবস্ত্র করে … ধর্ষণ করে … হত্যা করে। কার কী সাধ্য আছে তাদের বিরুদ্ধে কিছু বলার?

লেখাটি ১,০২৩ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

RFL
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.