নারী জঙ্গি বনাম নারীর প্রগতিশীলতা

0

কেয়া তালুকদার: পুরুষশাসিত সমাজে, কোনো কোনো নারীর বিস্ময়কর অবদান দেখে বোঝা যায় যে নারী দুর্বল নয়, সে টিকে থেকে সংগ্রাম করতে জানে, এবং কেউ কেউ রোমহর্ষক অত্যাচারের মধ্যে বেঁচে থেকেও কখনো কখনো বিস্ময়ও সৃষ্টি করে; কিন্তু শুধু টিকে থাকাই তো জীবন নয়। যদি টিকে থাকাই সবকিছু হতো, তবে ক্রীতদাসেরা কখনো বিদ্রোহ করতো না, আর নারী আন্দোলনও ইতিহাস সৃষ্টি করতো না।

জীবনে সৃষ্টিশীলতা, ইন্দ্রিয়ের স্বাধীনতা, সুখের সন্ধানে পথ চলা, প্রতিটি মুহূর্ত স্বাধীনভাবে উপভোগ করা, স্বাধীনভাবে নিজের মতামত ব্যক্ত করা, ক্রমশ মানুষ হয়ে ওঠার সংগ্রাম ও এরকম আরো অনেক অনেক কিছুই নারী স্বাধীনতা। নারী স্বাধীনতার মূল বিষয়গুলো শুধু গ্রন্থে বন্দী হয়ে থাকার জন্য নয়, জীবনের প্রতিটি এলাকায় যদি তার কোনো প্রতিফলন না ঘটে, তবে তা মূল্যহীন।

নারীর স্বাধীনতার অন্তরায় হলো ধর্মান্ধতা ৷

১) নারী স্বাধীনতা কাকে বলে?

২) নারী কি?

খুব সংক্ষিপ্তভাবে, প্রাথমিক স্তরে, নারী স্বাধীনতা বলতে আমি যা বুঝি তা হলো:

১) নারী ও পুরুষ দু’জনেই মানুষ, কাজেই একজন মানুষ অন্য একজন মানুষের অধিকারে থাকতে পারে না।

২) নিজের মন, শরীর ও স্বপ্নের উপর নারীর পূর্ণ অধিকার থাকতে হবে।

৩) সমাজ ও রাষ্ট্রের সকল স্তরে নারী ও পুরুষের সমান অধিকার থাকতে হবে।

৪) নারীকে পূর্ণ অর্থনৈতিক মুক্তি লাভ করতে হবে।

৫) নারীর মন ও শরীর ধর্মের শাসন থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত হতে হবে।

ধর্মান্ধতা নারীর প্রগতিশীলতাকে ভয় পায়৷ প্রগতিশীল নারী বলতে অশ্লীলতাকে বুঝায় না ৷ যে সব নারী সমাজের অন্ধ বিশ্বাসকে পিছনে ফেলে শিক্ষিত হয়ে পুরুষতান্ত্রিক মানসিকতার গণ্ডি পেরিয়ে পরিবারের বহির্জগতে উন্নয়ন কাজে নিজেদের যুক্ত করে, নারী-পুরুষের যেসব ক্ষেত্রে বৈষম্য আছে সেগুলো থেকে নিজেদের মুক্ত করে, নিজের মন, শরীর ও স্বপ্নের উপর নিজের নিয়ন্ত্রণ করতে চায়, নিজের মন ও শরীরের উপর ধর্মান্ধের প্রভাব থেকে নিজকে আলাদা রাখতে চায়, তখনই ধর্মান্ধ কিছু মানুষ এটাকে মেনে নিতে পারে না ৷

কারণ নারী যদি ঘরের বাইরে পা রেখে আয়মূলক অথবা মানব সেবামূলক কাজে নিজেদের যুক্ত করেন তখন নারীর ক্ষমতায়ন বৃদ্ধি পায় ৷ নারীর স্বাধীন চিন্তাচেতনা গুলোকে কাজে লাগিয়ে উন্নয়নের দিকে ধাবিত হয় ৷ তখন তারা পুরুষদের আজন্ম লালিত চিন্তা ধারাকে মানতে চায়না ৷ তখনই বিবাদ আর দ্বন্দ লেগে যায় ৷ পুরুষতান্ত্রিক মানসিকতার বিলুপ্তি ঘটায় ৷ ফলে নারীদের এই প্রগতিশীলকে তারা ভয় পায়৷ নিজেদের অস্তিত্বকে টিকিয়ে রাখা বা নারীকে দমন করার জন্য পর্দাপ্রথার ভিতরে আটকে রাখতে চায় ৷

সাম্প্রতিক সময়ে তিনটি আলোচিত ঘটনা আমাদেরকে নাড়া দেয়। আসুন, ঘটনাগুলো একটু স্মরণ করি:

এক. সারাদেশে তারুণ্যের গণজাগরণ যখন বহুদিনের অমীমাংসিত বিষয় যুদ্ধাপরাধের বিচারের দাবিকে ত্বরান্বিত করছিল, ঠিক তখনই হেফাজতে ইসলাম নামক একটি ভুঁইফোঁড় সংগঠন সরকারকে তের দফা দাবিসহ আল্টিমেটাম দিয়ে বসে, প্রত্যেকটি দাবিই খুব ভয়ানক। তবে চার ও পাঁচ নং দাবি শুধু ভয়ানকই নয়, বরং রাষ্ট্র সমাজ সভ্যতা-তথা মানুষের জন্য হুমকিস্বরূপ।

তাদের দাবি ছিল, নারী ও পুরুষের পারস্পরিক মেলামেশা বন্ধ করতে ও নারীকে ঘরে ফিরে যেতে।

দুই. ৬ এপ্রিল ঢাকায় হেফাজতে ইসলামের সমাবেশে সাংবাদিক নাদিয়া শারমিন এর উপর হামলা চালানো হয়। একই সমাবেশে মাথায় কাপড় না দেওয়ার অজুহাতে লাঞ্ছিত করা হয় সাংবাদিক জাকিয়া আহমেদ ও আরাফাত আরাকে।

তিন. দেশের বহুল প্রচারিত একটি জাতীয় দৈনিকে বর্ষবরণ সংখ্যায় বিশেষ ক্রোড়পত্রে গণজাগরণ মঞ্চে নারী কর্মীকে কটাক্ষ করে ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত হয়ে গল্প ছাপানো হয়। এবং এ গল্পটি সকল নারী আন্দোলন কর্মীর জন্য অপমানজনক।

সাম্প্রতিক সময়ে আশকোনাতে দুই নারী জঙ্গি ধরা পড়ে এবং তারা স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দী দেয় যে, তাদের স্বামীরাই তাদেরকে এই পথে আসতে বাধ্য করেছে।

পুরুষতান্ত্রিক সমাজ ব্যবস্থা নারীকে দাসী হিসাবে পেতে চায়। নারীকে ঘরের বাইরে যেতে বাধা দেয়। সেই দাসত্বকে স্বীকার করে নারী আজ জঙ্গি হয়ে উঠছে ৷ অথচ নারীদের উচিত ছিল, তাদের স্বামীদেরকে এই পথে যেতে বাধা দেয়া। তা না হয়ে সন্তানদেরকে হাতিয়ার করে জীবনবাজি রেখে জঙ্গি হামলায় অংশগ্রহণ করছে ৷ যা ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য হুমকিস্বরূপ, দেশের জন্য ক্ষতিকর ৷

নারীদের ধর্মান্ধতা ও দাসত্ব থেকে বেরিয়ে এসে প্রগতিশীল চিন্তায় ধাবিত হয়ে এই ধ্বংসাত্মক কাজ থেকে দেশকে বাঁচাতে হবে। এছাড়াও সরকারের গবেষণামূলক কাজ, আইনের কঠোরতা, প্রশাসনের অনুসন্ধানমূলক কার্যক্রম এবং সাংস্কৃতিক চর্চায় মানুষদের নিয়োজিত করতে হবে৷

লেখাটি 0 বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

RFL
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.