RFL

নারী স্বাধীনতা বনাম আমাদের চিন্তাধারা!

0

ফেরদৌস কান্তা: দেশ বাস্তবিকেই অনেক এগিয়েছে। কিন্তু জাতি হিসাবে আমরা নিয়ম করেই পিছিয়েছি। যতোটা দেশ ডিজিটাল হয়েছে ততোটাই আমরা মন-মানসিকতায় পিছিয়েছি। কেন এই পশ্চাৎপদ অবস্থান আমাদের! কারণ একটাই, আমরা নারী জাগরণ আর উন্নয়নের কথা বলতে গিয়ে দম নেবারও অবকাশ পাই না। অনেক চিন্তাও আসে আমাদের মাথায় সারাক্ষণ নারীর মুক্তির ব্যাপারে করণীয়, কিন্তু সেটা অবশ্যই শুধুমাত্র পরের মেয়ে, বোন বা বউয়ের জন্য। নিজের বউ-ঝির এর জন্য? নো এন্ড নেভার!

ফেরদৌস কান্তা

রুপালী পর্দার নারীদের নিয়ে স্বপ্ন বুনেন না, এমন পুরুষ কটা আছেন জানি না। কিন্তু সেই স্বপ্নে যদি তিনি বা তারা বিছানা পর্যন্তও যান, কোনো সমস্যা নাই। তারা সবার মনের রানী। কিন্তু সমস্যা তখন হয়, যখন ব্যক্তিগত আলোচনায় আসেন সেই পর্দা কাঁপানো রানীরা। তখন তাদের বেশ্যা আর মাগী ছাড়া অন্য কিছু ভাবেন এমন পুরুষ অনেক কম। কারণ আমাদের পুরুষদের চোখে ভালো মেয়ের সংজ্ঞা আলাদা। বাইরে বের হওয়া মেয়েরা খুব সহজলভ্য!

ভালো মেয়েরা সিনেমা-নাটক করে না, মডেলিং করে না। চাকুরি করে না। খুব দরকার না হলে বাড়ির বাইরে যায় না। ভালো মেয়েরা সন্ধ্যার আগে খোঁয়াড়ে (বাসায়) এসে পড়ে। পুরুষদের সাথে মেশে না। ভালো মেয়েরা হয় বোবা-কালা জাতীয় প্রাণী। এই প্রজাতি পুরুষ মানুষের কোনো দোষ খুঁজে পায় না। পুরুষের লাথি গুঁতায় তারা জান্নাতবাসিনী বা স্বর্গে যাবার খোয়াব দেখেন। পুরুষ যতোই বেশ্যার সাথে রাত কাটায়ে বাসায় ফিরুক , সব দোষ ছিল অই বেশ্যার। স্বামী বেচারারা একটু-আধটু বেশরম প্রজাতির হয়েই থাকে। তাই বলে বেশ্যারা হামলে পড়বে? সব দোষ রাস্তার মেয়েগুলির।

দুই/চারদিন আগে একটা নিউজ দেখলাম। কোনো এক নায়িকা বিমানে ভ্রমণকালীন যৌন হয়রানির শিকার হয়েছেন। নাহ, এই নিউজটা আমাকে কষ্ট দেয়নি। কারণ বিভিন্ন সময় দেখেছি নায়িকারা নানানভাবে তাদের ভক্তদের দ্বারাই হয়রানির শিকার হন বেশি। যেটা আমায় কষ্ট দিয়েছে, তাহলো নিউজের নিচের কমেন্টগুলি। কিছু কমেন্ট চোখে পড়েছে বলেই পড়েছি। কী জঘণ্য ভাষায় নায়িকাকে যা তা বলা হয়েছে। যেন নায়িকা মানেই গণিমতের মাল। যেন তাদের মান-সম্মান থাকতে নেই! কী আশ্চর্য আমাদের মন-মানসিকতা! তাদের নিয়ে যা খুশি বলা যায়, করার চিন্তাও করা যায়।

নারীগণ যারা রুপালী জগতে নাই, কিন্তু শখের বশে কিংবা মনের আবেগে শিল্পচর্চা করেন, তাদেরও সমাজের মানুষ বেশ্যা বা মাগী বলে পেছনে গাল দেয়। কী কারণ? কারণ বেশি কিছু না কিন্তু। কারণ হলো এরা সমাজের চোখ রাঙানী উপেক্ষা করেও মনের শান্তির খোঁজ বন্ধ রাখেন না। দিন হলে সমস্যা নাই, কিন্তু শিল্পচর্চার নামে রাত-বিরাতে বাসায় ফেরাই হলো এরা যে খারাপ তার প্রমাণ। আমাদের রক্ত কথা বলে, ভালো ঘরের বউ-ঝিরা রাত করে বাসায় ফেরে না। যে কারণে তনুর মতো মেয়েরাও ভালো মানুষরুপি হায়েনাদের কবল থেকে মুক্তি পায় না। মাথায় হিজাব দিলে কী হবে! ওই মেয়ে খারাপ, কারণ নাট্যচর্চা করতো, রাতে টিউশনি করে বাসায় ফিরতো।

ঘরের পুরুষটি, সে বাবা, ভাই বা স্বামী যেই হোক না কেন, অন্য মেয়েদের কথা খুব প্রশংসার সাথে উদাহরণ দিলেও কখনোই নিজের মেয়ে, বোন বা বউকে সেটা করতে দিতে চান না। কেন এই মানসিকতা আমাদের? অমুকের মেয়েকে দেখেছো টিউশন করে চলে, কী লক্ষ্মী মেয়ে! কিন্তু যখনই নিজের মেয়েটা টিউশন করতে যায়, সাথে সাথে প্রতিবাদ, আমি কি মরে গেছি, তোর কামাই করতে যেতে হবে? এখানে যে ব্যাপারটা কামাইয়ের না শুধু, টাকার সাথে জড়িয়ে থাকে নিজের পায়ে দাঁড়ানোর স্বপ্ন, সেটা বাবা-মায়েরা কবে বুঝবেন?

যেটা নিয়ে আসলে আমার নিজেরই ভীষণ মাথাব্যথা, এবং চাই যে সমাজের বিশেষত পুরুষদের দৃষ্টিভঙ্গি শিগগিরই পরিবর্তন হবে, সেটা হলো মেয়েদের জব। কেন জানি পুরুষেরা জব করা মেয়েদের ভয় পান। কাছের অনেক বন্ধুদেরই বলতে শুনি, তারা বউদের জব করতে দিতে চান না।

কারণ জব করলে আর কন্ট্রোল করা যায় না। তখন সংসারি থাকে না বউয়েরা। সংসারি মেয়েরা ঘরেই থাকে। সারাদিন ঘর সামলায়, রান্নাবান্না করে আর বাচ্চা সামলায়। এরাই আদর্শ মেয়ে সমাজের চোখে। টাকা হাতে এলে মেয়েরা পুরুষদের মানে না। আরও নানারকম যুক্তি।

অথচ, আমার নিজের কিংবা কাছের অনেকের যারা জব করেন, দেখি যে আমাদের আর ডবল খাটা লাগে ঘরে-বাইরে সমান তালে। আমার অবশ্য জবাবঅদিহি করবার কেউ নাই। কিন্তু যাদের আছেন, তারা সারাক্ষণই ব্যতিব্যস্ত থাকেন ঘর-বাহির দুইটার তাল সামলে চলতে। অনেকেই তাল হারিয়ে শেষ পর্যন্ত সুগৃহিণীতে রূপান্তরিত হন। আমি যারা বাসায় থাকেন, তাদের প্রতি পূর্ণ শ্রদ্ধা রেখেই বলছি, একটা মেয়ে যখন জব করে তখন তাকে অনেক বেশি পরিশ্রম করা লাগে। ঘরে যেমন প্রমাণ দেয়া লাগে যোগ্যতা, তেমনি জবের ক্ষেত্রেও ।

আমরা মুখে যতটা উদার জাতি, তার চেয়ে বেশি পেছানো জাতি মনে মনে। খুব খারাপ লাগে যখন দেখি একটা মেয়ে ডাক্তারি বা ইঞ্জিনিয়ারিং পড়া শেষ করেও কিছু করতে পারে না। বাচ্চা আর সংসার সামলাতে গিয়ে তার মেধা নষ্ট হয়ে যায়। অনেক উজ্জ্বল একাডেমিক ক্যারিয়ারের মেয়েরা ঝরে যায় পরিবারের সহযোগিতার অভাবে। বাইরের চেয়ে বেশি দরকার ঘরের মানুষটির সাহায্য।

মনোবল বলতে আমরা যা বুঝি তা কিন্তু কাছের মানুষ থেকেই পেতে হয়। স্বাধীনতার এতো বছর পরেও মুক্তি বাকি। অনেক কিছু থেকে মুক্ত হতে হবে আমাদের। সবার আগে চাই  অবরুদ্ধ চিন্তা-চেতনার মুক্তি। মুখে যতোই নিজেদের আধুনিক বলি, যদি মনের মুক্তি না ঘটে সব বৃথা। অনেক ত্যাগে পাওয়া দেশটাকে একসাথে এগিয়ে নেবার স্বপ্নটা সত্যি হোক।   

লেখাটি ৫৯১ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

RFL
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.