RFL

সুদীপা আমার খুব চেনা

0

সাদিয়া নাসরিন: গত দুদিন ধরে সুদীপা আমার মাথায় ঢুকে বসে আছে। ‘প্রাক্তন’ ছবির মূল চরিত্র সুদীপা। সুক্ষ্ম রুচিবোধ আর ব্যক্তিত্ব নিয়ে একলা, নির্বান্ধব হয়ে যাওয়া সুদীপাকে আমি খুব ভালো চিনি। সুদীপার ব্যক্তিত্ব, যোগ্যতা, উচ্চাকাঙ্খা, আবেগ, ভুলভাল ভালোবাসা, ইগো, মর্যাদাবোধ, স্বাতন্ত্র্যের লড়াই, অপেক্ষা, বঞ্চনা, আপোসের দহন, অপমান এবং প্রতিবাদের ভাষা, এই সবই আমার এতো চেনা যে একদম নতুন কিছু মনে হয়নি।

দাম্পত্য নিয়ে সুদীপার নিজস্ব প্রত্যাশাকেও আমি ধারণ করতে পারি আমি একদম নিজের মতো করেই। দাম্পত্যকে কেবল শরীরের ঘষাঘষিতে মেরে না ফেলে সুদীপা স্বাতন্ত্র্য আর মর্যার সম্মানে বড় করতে তুলতে চায়। সুদীপা দাম্পত্যে প্রেম চায়, মনোযোগ চায়, সম্পর্কের জন্য সময় চায়। সুদীপা উজানকে যখন বলছিলো, “একটা ভালো ট্যুরের আগে যেমন কনসেন্ট্রেট করতে হয়, একটা ভালো ডিজাইন করতে হলে সব কিছু ভুলতে হয়, মনটাকে এক জায়গায় নিয়ে আসতে হয়, প্রেমটাও ঠিক তাই, সংসারটাও তাই…একটা জন্মদিন, একটা এনিভার্সারি, একটা উইকএন্ড…এসবের জন্য প্ল্যান করতে হবে। তোমার ট্যুর ক্যান্সেল করতে হবে, আমার মিটিং পোস্টপন্ড করতে হবে, মোবাইল ফোনগুলো সুইচ অফ করতে হবে”, সুদীপার সেই মুহুর্তের  প্রতিটি বিট আর পালস আমি ধরতে পারছিলাম, যে বিট মিস করে যায় উজানরা।

দাম্পত্য উজানদের জন্য একপেশে প্রাপ্তি। দাম্পত্যের জন্য তাদের ছাড়তে হয় না কিছুই। সুদীপারাই কেবল সব ছেড়ে দেয়। নিজের নাম, গোত্র, পছন্দ, অধিকার, স-ব ! সংসারের জন্য দিল্লী ছেড়ে কলকাতা এসে থাকতে হয় সুদীপাকে, চাকরি চেঞ্জ করতে হয়, মানিয়ে চলতে হয় উজানের পরিবারের সাথে, এমনকী আদর করার সময়ের স্টেপও!!

উজানের কাছে দাম্পত্য গ্রান্টেড, তাই উজান চায় সম্পর্কের নিয়ন্ত্রণ একার হাতে রাখতে। কী বিশ্রী স্থুলবোধ নিয়ে উজান বলে, “স্বামী তার বউকে গ্রান্টেড করবে না তো কাকে করবে!” সেই পৌরুষিক দেমাগ “এক্সেপ্ট মি ফর হোয়াট আই এম” (!!)।

দক্ষীণ এশিয় উজানরা এতো টিপিক্যাল, তাদের কাছে দাম্পত্য এতোটাই এলেবেলে জিনিষ যে কেবল সময়মতো শুতে পারলেই চলে, অন্তঃসত্বা স্ত্রীর “ডিফিকাল্ট প্রেগনেন্সি” জেনেও তার পাশে থাকার চেয়ে নিজের বিজনেস ট্যুর উজানের কাছে জরুরি হয়। কুসংস্কারাচ্ছন্ন মায়ের সেবাযত্নের উপর ভরসা করে, উজান বের হয়ে যায় পূজার সিজনাল বিজনেস ধরতে, যে মা কিনা নজর লাগার ভয়ে প্রেগনেন্সি লুকিয়ে রেখে সুদীপাকে বাধ্য করে পূজার সবরকম ফর্মালিটিজ করতে। আর সব আত্মীয়দের বাড়ি বাড়ি গিয়ে নিচু হয় প্রণাম করতে করতে সুদীপার ব্লিডিং হয়, সুদীপা উজানকে খোঁজে সেই সংকটে।

প্রায়োরিটি, প্রাইভেসি, সম্মান, মনোযোগ। পুরো সিনেমাটা জুড়েই সুদীপার হাহাকার একটু সময়ের জন্য, একটু মনোযোগের জন্য, একটু প্রাইভেসির জন্য। সুদীপার কাছে যখন দুদিনের একটা পার্সোনাল ট্যুর প্রয়োজন হয় নিজেদের খুঁজে দেখার জন্য, সম্পর্কটা ফিরে পাওয়ার জন্য, আর সংসারটা বাঁচানোর জন্য শেষ চেষ্টার জন্য, তখন উজানের প্রায়োরিটি হয়ে দাঁড়ায় বন্ধুর মায়ের মৃত্যু।

উজান যখন বন্ধুর মাকে নিয়ে শ্মশান ঘাটে যায়, সুদীপা বুঝতে পারে শ্মশানে গেছে আসলে তাদের সম্পর্কটা। সম্পর্কের মাঝে প্রায়োরিটি আর প্রাইভেসি খুঁজলে যে দিনের পর দিন একা হয়ে যেতে হয় মেয়েদের সেই বার্তা তো নতুন নয় সুদীপার জন্য।  কনসিভ করা থেকে মিসক্যারেজ, সবটুকু সময়েই তাই সুদীপা একলা। যখন বিসর্জনের দিন দুর্গা বিসর্জনের ঘটা করছিল উজান, তখন নিরব যন্ত্রণায় কাতরাতে কাতরাতে মাতৃত্বকেই বিসর্জন দিচ্ছিল একলা সুদীপা। উজান ছিলো না সুদীপার পাশে, ছিলো না কখনো, থাকে না উজানরা।

আদতে সুদীপারা এই সব ভুলভাল উজানদের ভালোবেসে অপরিণত আবেগে ভেসে যায়, যার মুল্য দেয় জীবন দিয়ে। উজনরা না জানে ভালোবাসতে, না জানে সম্মান করতে। এরা নিজের যোগ্যতার উচ্চতায় সুদীপাকে ছুঁতে পারেনা, পারেনা সুদীপার ব্যক্তিত্বকে ধারন করতে। তাই কেবলই ইনফেরিওরিটিওতে ছটফট করে আর জটিলতা তৈরী করে। শক্তি-সুনীল-দস্তুয়স্কি কপচানো উজান তাই নির্দ্বিধায়  বলে “আমার বউ আমার প্রপার্টি, বউ এর মোবাইল ও আমার প্রপার্টি”। ঘরের বউ (?) সুদীপা বাবার বাড়ি যেতে তাই উজানের “পারমিশন” লাগে। অফিসের বসের কাজের প্রশংসা উজানের মোটা মাথায় ইন্টারপ্রেট হয়, “হি ওয়ান্টস টু স্লিপ উইথ ইউ” বলে। প্রমোশনের খবর দিতে আসা সুদীপাকে উজান বলে, “এবার থেকে তাহলে রাতে বাড়ি ফেরাও বন্ধ হলো”।

এই সব স্থুল রুচির ফ্লেক্সিবল উজানরা একদম ভুল চয়েস সুদীপার। উজানদের রসায়ন আসলে কাজ করে মোটা শরীর ও ততোধিক মোটা রুচির মালিনীদের সাথে। নিরুপদ্রপ দাস জীবনটি টিকিয়ে রাখার জন্য মালিনীরা শ্বশুরবাড়ি আর স্বামীকে হাতে রাখার “ফাইভ ইয়ার্স ইনভেস্টমেন্ট” এর স্থুল তত্ত্ব দিয়ে সুখী সংসারের ব্রান্ডিং করে। দরদাম করে বাজার থেকে বেগুন কেনাতে পারলেই এরা মনে করে, বাহ, বেশ কব্জা করলাম তো স্বামীটিকে ! আর মাথামোটা উজানরাও স্বস্তি পায় বয়সে ছোট আর অযোগ্য মালিনীদের নিয়ে, যারা কথায় কথায় কাঁদে, ন্যাকামো করে, এডজাস্ট করে, বাচ্চা পালার জন্য চাকরি ছেড়ে দেয়, মাসে একবার স্বামীকে কাছে পেয়েই সুখে গদগদ হয় এবং স্বামীর জীবন নিয়ে কোন প্রশ্ন তোলে বিরক্ত করে না।

নিজের সবটুকু ছেড়ে দিয়ে এরা গালভরা গল্প মারে জীবনকে এক হাতে দিলে নাকি দুহাতে ফিরিয়ে দেয়। কিন্তু কী ফিরিয়ে দেয় সে প্রশ্নটি অপরাধবোধে ভোগা সুদীপা তোলে না বলেই মালিনি সস্তার থিওরী শিখিয়ে বের হয়ে যেতে পারে, “এডজাস্ট করা মানে হেরে যাওয়া নয়, বরং জিতে যাওয়া” !!

সাদিয়া নাসরিন

আর এই হাস্যকর সস্তা “এডজাস্টমেনট” তত্ত্বের দোলাচলে পড়ে সুদীপার মতো তীক্ষ্ণ খুরধার স্থপতিও একসময় সেপারেশনের জন্য নিজেকেই দায়ী মনে করে। অন্তত ছবির পুরুষ পরিচালক স্বাধীনতাকামী নারীদের এই বার্তাই দেয়ার চেষ্টা করেছেন মালিনীর মুখ দিয়ে। কিন্তু এ ও নতুন কিছু নয়। যুগ যুগ ধরে পুরুষতান্ত্রিক রাজনীতি মালিনীদের ব্যবহার করেই সুদীপাদেরকে উপহার দিয়েছে নিরন্তর অপরাধবোধ, হীনমন্যতা আর সব কিছুর জন্য নিজেকে দায়ী করার প্রবণতা। সুদীপাও এর বাইরে যায়নি, বা যেতে পারেনি।

কিন্তু বাস্তবে এমন অনেক সুদীপা আছেন যারা আক্ষরিক অর্থেই ‘পারমিশন’ আর ‘গ্রান্টেড’ জীবনের একপেশে দায় থেকে মুক্ত হয়েছেন সগৌরবে মাথা উঁচু করেই। সেই সুদীপাদের কাছে বরং এডজাস্ট করা মানেই হেরে যাওয়া, আর সোনার শেকলে বাঁধা পড়ে জীবনের অপচয়। বাস্তবের সুদীপারা তাই পেছনে ফেলে আসা জঞ্জালের জন্য হা পিত্যেশ করে না, বা উজানদের সস্তার লোক দেখানো প্রেম দেখে কষ্টে কেঁদেও ভাসে না। এই সুদীপাদের কাছে শেকল কেটে বের হয়ে আসতে পারা মানে মুক্তি, জীবনের সাধ, যোগ্যতার অহংকার।

আহারে, যদি ছবির সুদীপা একবার বাস্তবের সেই সুদীপার মুখোমুখি বসতে পারতো, রেলগাড়ির কামরায় একদিন!

লেখাটি ৬,২৯৩ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

RFL
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.