RFL

কারিনা, ঐশ্বরিয়ার ‘সত্ত্বা’ মিস্টারদের অধিকারে!

0

সুচিত্রা সরকার: কারিনার ছেলের নাম নিয়ে পেইজ থ্রি বেশ সরব। শিশুর নাম কেন তৈমুর! ভেবেছিলাম, ইন্টার ম্যারেজ সমস্যা! আদতে ব্যাপারটা কী, জানার আগ্রহ হয়নি! তারকাদের ব্যক্তিগত জগৎ নিয়ে মাথা ঘামানো, আমার কম্মো নয়! কিন্তু আজ ঋষি কাপুরের একটা সাক্ষাৎকার পড়ে মনে হলো, ব্যাপারটা আর তাদের ‘নিজেদের’ বিষয়ে নেই।

এটা আমারও বিষয়। নারীদের ‘একান্ত’ নিজের বিষয়! ঋষি কাপুর বলছেন, তৈমুর জং এর নামে হয়েছে, সমস্যাটা কী? তিনি ছ’শো বছর আগে একবারে ছ’শো দিল্লীবাসী মেরেছিলেন বলে? আলেকজান্ডার এর চেয়ে খারাপ! তার নামে তো কারো কোনো সমস্যা নেই!

অবস্থাটা এই যে- বড় বড় জিনিস বেরিয়ে যাচ্ছে সদর দরজা দিয়ে, চোরে সিঁদ কেটে সূঁচ নিলে তাতেই আমরা বিহ্বল। ঋষিজী, নাম তৈমুর বা আদিত্য যাই হোক, সমস্যাটা এখানে নয়! সমস্যাটা আরো গভীরে!

আচ্ছা, নামটা কেন তৈমুর আলী খান পতৌদি হলো? সাইফের মা শর্মিলা, রবি ঠাকুরের বংশধর। হোক সে লতায় আর পাতায়। নামটায় কেন ঠাকুর পরিবারের চিহ্ন রইলো না? মেয়েদের তবে গোত্রান্তর হয়! চোখের পলকে!
কাপুর পরিবারের মর্যাদাও কি সমাজে কম? কই নামের মধ্যে কাপুর উপাধি তো জায়গা পেল না। কর্পুরের মতো উবে গেল। সে খেয়াল আছে?

তার মানে কি দাঁড়াচ্ছে যে, বিয়ের পরে, মেয়েরা বরের বংশের, ‘অংশ’ হয়ে যায়? পরগাছার মত। নিজের বংশ পরিচয় বিলীন করে, নিজের সত্ত্বাকে ধ্বংস করে, স্বর্ণলতার মত ঝুলে থাকে আমগাছে। তফাত একটাই, স্বর্ণলতার ডালে আমের মুকুল হয় না। কারিনাদের, ‘মানুষ নারী’দের হয়!

তৈমুরের নামটা কী হবে, উপাধি কী বসবে, আদৌ উপাধি থাকবে কিনা, কারিনার কি সে সিদ্ধান্তের জায়গা আছে? না কি কারিনারা – নারীরা কেবল যুগ যুগ ধরে ‘গর্ভভাড়া’ দিয়েই যাচ্ছে! আর সন্তান লালনের মত টাফ জব চমৎকারভাবে হ্যান্ডেল করতে পারলে রত্নগর্ভা উপাধিতে ভূষিত হচ্ছে! বাদবাকি সিদ্ধান্ত বাপেদের!

পেইজ থ্রির আরেকটি খবরেও বেশ চমকে উঠেছিলাম। বা বলা ভালো, খবরটি জানার পর থেকে অপেক্ষা করছি, কবে দেখতে পাবো, বড় বড় অক্ষরে লেখা হেডলাইন ‘ঐশ্বরিয়া রাই গতরাতে আত্মহত্যা করেছেন।’ হুম, সে পর্যায় অবধি চলে গেছেন তিনি। এখন কেবল অপেক্ষা!

ঐশ্বরিয়া রাই কবে থেকে প্রিয়, সে হিসেব আমার কাছে নেই। বয়ঃসন্ধিকাল থেকেই বোধহয়! সদ্য সদ্য প্রেম করতে শিখেছি, তখন থেকে। এতোটাই প্রিয় যে, তাঁর বা হাতের কনুইয়ের খানিক উপরে একটা জঁড়ুল আছে, এটাও চোখ এড়ায় না।

তিনি আদতে এই পুরুষতান্ত্রিক সমাজের, চলচ্চিত্রে আস্ত একটি পণ্য। পুরুষ তাঁকে দেখে যত সুখ পায়, সিনেমার টিকিট তত বেশি বিক্রি হয়! পরবর্তী ছবির কাস্টের দাম তত বাড়ে।

অতো খোলামেলা না হলে, হয়তো কাটতি বাড়তো না সিনেমার। আর তিনিও এতো অর্থ-যশ কামাতেন না। সে ব্যাপারে কোনো দ্বিধা নেই আমার!

উচ্চমাধ্যমিক বোর্ড পরীক্ষায় নব্বই শতাংশ নম্বর পেয়েছিলেন। প্রকৌশলী না হয়ে মডেল। বিশ্বসুন্দরীর নীল মুকুট নিলেন মাথায় (বিশ্বসুন্দরী হতে গেলেও, নারীপণ্যটার কোয়ান্টিটি ও কোয়ালিটি- দুটোই পরীক্ষায় পাশ করতে হয় বলে শুনেছি)। অভিনয়ে তিনি অদক্ষ, এমনটা কখনো শুনিনি। বেশ কয়েকটা পুরষ্কারও তাই তাঁর নামের পাশে জ্বলজ্বল করছে!

এসবের সঙ্গে নিশ্চয়ই মাসান্তে, তাঁর নামে কিছু খবর সিনে পত্রিকায় ছাপা হয়েছেই। নইলে কাটতি বাড়ে না পাতার! সেসব খবরে যেমন আছেন সালমান, আছেন বিবেক, আরো নানা নামধাম। ইয়ত্তা নেই অতোসব!

এতোসবের পরেই মেয়েটির বিয়ে হলো। বিয়ের পর যে প্রচলিত ধারণায়, তিনি বচ্চনবধূ, সেটা ভক্তরা বুঝলো ভালোভাবেই। নাম নিলেন ঐশ্বরিয়া রাই বচ্চন। খানিক আপত্তি ছিল মনে, কিন্তু কি আর করা, বুজরুকি মেনে নিতেই হয়!
ঐশ্বরিয়া সন্তানসম্ভবা, একদিন পড়লাম। আরো পড়লাম, ‘হিরোইন’ ছবির শুটিংয়ে ‘কনসিভ’ এর খবর দিব্যি চেপে গেছেন। পরে পরিচালক মধুর ভান্ডারকর বিষয়টি জানতে পেরে কারিনা কাপুরকে নিয়েছিলেন। কতটা মরিয়া হলে ‘ছল’ করতে হয়? এবং ‘ছল’ করে পার না পেলে বুকের কোথায় গিয়ে লাগে অপমানটা?

মা ঐশ্বরিয়া সব সামলাচ্ছেন। সন্তান, শ্বশুর, শাশুড়ি, বর। কোয়ালিটি টাইম দিচ্ছেন ‘নিজের’ (অবাস্তব, চরমতম হাস্যরস!) মানুষদের। আহা, কী সুখের হাসি। চোখদুটো আরো নীল! তবু সিনেমা করা হচ্ছে না!
মুটিয়ে যাচ্ছেন, বুড়িয়ে যাচ্ছেন। কোনো পরিচালকের আর আগ্রহ নেই। আর বর, অভিষেক, একই পেশার মানুষ, দিব্যি নিজের ক্যারিয়ার গুছিয়ে যাচ্ছেন!

বাবার কি করার আছে সন্তানের জন্য? মা সন্তানের জন্য সময় দেবে, তিল তিল করে নিজেকে নিঃশ্বেষ করবে, এটাই তো স্বাভাবিক! এর মধ্য দিয়ে, হার্ড ওয়ার্ক করে, যারা মেধার প্রমান দিয়ে যাবে, তারাই গ্রেট লেডি! হাহ্!

বিয়ের পর ‘ধুম টু’ করলেন। বউমার স্পর্শকাতর দৃশ্য দেখে, জয়া বচ্চন হল থেকে বেরিয়ে এসেছিলেন, গটগট করে এবং রাগী ভঙ্গিতে। আর এবার ‘এ্যায় দিল হ্যায় মুসকিল’ এ আরো বেশি স্পর্শকাতর দৃশ্য! সহ্যের সীমা ছাড়িয়েছে বরপক্ষের। প্রকাশ্যে তাই শাশুড়ি, বউমাকে নির্লজ্জ বলতেও ছাড়ছেন না! হাস্যকর, এটাই যে, শাশুড়িও অভিনেত্রী। একসময়ের দাপুটে!

সুচিত্রা সরকার

শ্বশুর অমিতাভ, সেন্সর বোর্ডে গিয়ে সিনেমাটায় কাঁচি চালিয়ে দিয়ে এলেন! ক্ষমতাবলে। অবশ্য পরে, কলকাতা আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে নারীর ক্ষমতায়ন বিষয় বক্তৃতায় অমিতাভ বচ্চন বৌমার খুব প্রশংসা করলেন। বিষয়টা যে ‘নারীর ক্ষমতায়ন’! আশপাশের ডালপালা ধরেই তো টানবেন! বিষয়টা যদি হতো, ‘চলচ্চিত্রে নারীর পণ্যায়ন’, তবে, আর দেখতে হতো না। আগুনে ঘি ঢালার পরের দৃশ্যায়ন দেখতো দর্শকরা।

প্রিয় বর, অভিষেক, প্রিমিয়ার দেখতে গেলেনই না। সেন্টুতে লেগেছে? না জেলাসি? নাকি ঘরের বউয়ের এই সাহস মেনে নিতে পারেননি?
ভারী অদ্ভুত ও ছেলেমানুষ এই পুরুষতন্ত্র। এবং এর ধ্বজ্জাধারীরা। আচ্ছা, ঐশ্বরিয়া কী, কেন, কেমন- এসব কি বরপক্ষ জানতেন না? নাকি, বিয়ের পর জীবনে পর্দায় দেখা দেবেন না, এমন পণ করেছিলেন ঐশ্বরিয়া? নাকি বলেছিলেন, বিয়ের পর আর কারো সঙ্গে যৌন দৃশ্যে অভিনয় করবেন না? সতী-সাধ্বী, লক্ষ্মীমন্ত হয়ে যাবেন!

অন্যদিকে, অভিষেকের অতো ভাবতে হয় কি? কটা রগরগে সিন আছে, ঐশ্বরিয়ার বাবা কি সেসব খুঁজছেন?
যে মেয়েটা বিয়ের আগে সব স্বাভাবিকভাবে করলো, কারো কিছু এলো-গেলো না, বিয়ের পর কী এমন হলো? বিয়ের আগেও শরীর, মন, সত্ত্বার সিদ্ধান্ত পুরুষদের। বিয়ের পরও সকল সিদ্ধান্ত পুরুষপক্ষেরই। শুধু দাবার ঘরগুলো আর গুটিগুলোর রঙ পাল্টায়!

নারীদের মুক্তি নাকি অর্থনৈতিক ক্ষমতায়? পুরোপুরি ঠিক নয় কথাটা। কারিনা আর ঐশ্বরিয়ার তো অনেক টাকা। তাহলে তাদের চিন্তার স্বাধীনতা নেই কেন?
কেন ঐশ্বরিয়াকে বলতে হচ্ছে, ‘ক্যারিয়ারের এতো বছর, এত কাজ করার পরও, এখন এসে এসব কথা শুনতে হচ্ছে?’ কেন, তাঁকে বলতে হয়, ‘এমন ঘৃণ্য জীবনের চেয়ে মৃত্যু ভালো!’

গণ্ডগোলটা গোড়ায়!
ঐশ্বরিয়া অভিনীত ‘গুরু’ ছবির ‘বারসো রে মেঘা মেঘা’ গানটা শুনছি। মন দিয়ে। গানের শেষের দিকে ঐশ্বরিয়া বাবাকে চিঠিতে জিজ্ঞেস করছেন, ‘বাপু, আপ দেশ আজাদ হ্যায়! তো আপকে বেটি কিঁও নেহি’ (বাবা, তোমার দেশ স্বাধীন হয়েছে, তোমার মেয়ে কেন নয়!)? শিহরিত হই! কেঁপে ওঠি!

গণ্ডগোলটা এখানেই। পৃথিবীর তাবৎ তাবৎ জিনিস পাল্টে গেলেও, রোকেয়ার ‘সুলতানার স্বপ্ন’ আজও অধরা! ফ্যান্টাসি! সিনেমার চরিত্র থেকে বাস্তবের জীবন্ত নারী, কেউ স্বাধীন নয়! অর্থনৈতিক ক্ষমতায়ন হলেও নয়! কারণ, নারীর সত্ত্বাটা বাঁধা পড়ে আছে আদমের বাঁ পাজরের হাড়ে! নারীর সব প্রশ্নের উত্তর পুরুষতন্ত্রের ‘তান্ত্রিক’ ওই সাধুবাবাদের কাছে!

যেদিন এ ধারণা ভাঙবে, যেদিন পৃথিবীর মানুষ বুঝতে শিখবে, নারীর নিজস্ব সত্ত্বা আছে, মন আছে, ইচ্ছে আছে, সম্মান আছে- সেদিন নারী মুক্ত, স্বাধীন!

যেদিন মানুষ বিশ্বাস করবে, বিয়ের আগে বা পরে, নারী কখনোই অন্যের অধীন নয়, অন্যের ইচ্ছের দাস নয়, সেদিন আর ‘সুলতানার স্বপ্ন’ বইটার প্রয়োজন পড়বে না। নারী – পুরুষ কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে এক আলোর ইতিহাস নির্মাণ করবো।

২৪.১২.২০১৬

লেখাটি ৮,৫৮৮ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

RFL
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.