RFL

‘স্ট্রিট হ্যারাসমেন্ট’কে শাস্তিযোগ্য অপরাধ ঘোষণা করা হোক  

0

নীলপদ্ম: গত শীতের কথা। দুপুর ১টা বাজে সম্ভবত! রাস্তা মোটামুটি খালি, রাইফেলস স্কয়ার  থেকে ফিরছিলাম…আমি রিকশায় যাচ্ছি, স্পিড ভালই ছিল। হঠাৎ পেছন থেকে এক বাইক সামনে চলে এলো… যে চালাচ্ছে সে হঠাৎ স্লো করে ফেললো। আমি তাকাতেই চালকের পেছনে বসা ব্যক্তি বলল- আপনি অনেক সুন্দর! বলার মধ্যে  এডমায়ারেশন ছিল। বাজেভাবে বলে নাই… বলেই চলে গেল বাইক টান দিয়ে।

খুব ভিতু আমার হাত-পা ঠাণ্ডা হয়ে গেল মুহূর্তেই! জীবনেও এই ধরনের অভিজ্ঞতা হয় নাই। কেননা আমার চলাফেরা খুব সিম্পল। কোনভাবেই দৃষ্টি আকর্ষণের মতো আমি চলি না। সেই আমাকে এ ধরনের কিছুতে পড়তে হবে ভাবিই নাই। আপাতদৃষ্টিতে এই ঘটনা খুব রোমাঞ্চকর লাগার কথা, কিংবা হাসতে হাসতে বন্ধুদের সাথে শেয়ার করার কথা! কিন্তু আমার খুব রাগ হয়েছিল আর খুব অপমান লেগেছিল।  

এভাবে বলবে কেন আর বলবেই বা কেন-  এই দুই প্রশ্নেই মেজাজ গরম হচ্ছিল বারবারসাথে পুরুষ কেউ থাকলে পারতো এভাবে বলতে? পারতো না। চারপাশের মেয়েরা যা ফেস করে তার তুলনায় এই ঘটনা কিছুই না, কিন্তু তার পরেও এই আচরণ আমার ভালো লাগে নাই। মানসিক যন্ত্রণা পেয়েছি।

স্ট্রিট হ্যারাসমেন্ট নতুন কিছু না মেয়েদের জন্য। মেয়ে হবে আর স্ট্রিট হ্যারাসমেন্ট এর শিকার হবে না এ যেন হতেই পারে না! তবে ইদানিং যা শুরু হয়েছে তা বোধ করি সবকিছুকে ছাড়িয়ে যাচ্ছে। প্যান্টের জিপার খোলা রেখে বাসের নারী যাত্রীদের শরীর ঘেঁষে দাঁড়ানো! কিংবা নারী যাত্রীদের তুলে সিএনজি চালকদের বা রিকশা চালকদের মাস্টারবেশন! কী ভয়াবহ অবক্ষয় শুরু হয়েছে! নিজের অভিজ্ঞতা হলো কিছুদিন আগে! এসব এতোদিন শুধু ফেসবুকের পাতাতেই পড়তাম!  

গত মাসে নিউমার্কেটে গেলে ভয়ংকর এক ব্যাপার দেখা হয়েছিল। নিউমার্কেটের ভেতরে রাস্তার দুই পাশে পোশাক  বিক্রেতাদের একজনের সাথে দামাদামি করছিল টিনএজ এক মেয়েসাথে খুব সম্ভবত বয়ফ্রেন্ডমেয়ের পোশাক ছিল figurehugging বলতে যা বোঝায় তাই। টাইট কামিজ, বুকের উপর ওড়না। সব মিলিয়ে সে নজর কাড়বেই।  

ঐ দোকানের পাশেই আমার বন্ধু টপস দেখছে, সাইডে আমি দাঁড়ানো। হঠাৎ আমার চোখ গেল সেই টিনএজ মেয়ে যে বিক্রেতার থেকে কিনছে সে বিক্রেতার পাশের জনের দিকে। মেয়ের দিকে সে ভয়াবহ কামাতুর চোখে তাকিয়ে আছে এবং তার হাত দুই পায়ের মাঝখানে ব্যস্ত।

দিনে দুপুরে এই অস্বাভাবিক ঘটনাটা কী সত্যি ঘটছে কিনা তা প্রথমে আমি বুঝতেই পারছিলাম না। সেই ব্যক্তি তার সামনে থাকা জামা কাপড়ের সাথে এমন এক পজিশন করে দাঁড়িয়েছিল যে ঐ মেয়ে না দেখলেও আমরা যারা সাইডে ছিলাম তারা দেখতে পাচ্ছিলাম।

বন্ধুকে ইশারা করলাম, ও দেখে ফ্যাকাসে হয়ে গেল। হতভম্ব, বিধ্বস্ত আমরা এক মুহূর্তও আর সেখানে থাকি নাই। কিছু বলার মতো সাহস হয়ে ওঠেনি আমাদের… কীইবা বলতাম! এত জঘণ্য একটা ব্যাপার নিয়ে কথা বলার রুচিই তো নাই, সাহস তো পরের ব্যাপার! তার উপর এমন অভিজ্ঞতা জীবনে প্রথম!

ঘেন্নায় বেশ কিছুদিন সুস্থভাবে কিছু চিন্তা করতে পারি নাই! ‘পুরুষের চোখ’ আর ‘পুরুষের হাত’  এই জিনিসগুলো প্রত্যেক মেয়ে্র কাছে আতংকের, ঘেন্নার  বিষয়! এই চোখ, হাত থেকে যেন রেহাই নাই!  এক বান্ধবীকে চিনতাম, সে তার বাবার থেকেও দূরে থাকত! পুরুষ জাতিকে এতোই ঘৃণা  করতো সে! বলা বাহুল্য নিশ্চয়ই পুরুষের দ্বারাই নিশ্চয়ই এমন কোন অভিজ্ঞতা হয়েছিল যার কারণে তার ঘৃণার তীব্রতা বাবা পর্যন্ত পৌঁছে গেছে!!

অবস্থা যা দেখছি তাতে ভবিষ্যত নিয়ে চিন্তিতই আমিএইভাবে দিনে-দুপুরে মাস্টারবেশন এর যে রেওয়াজ চালু হচ্ছে, তা শুরুতেই থামিয়ে দেয়া দরকার!

বিভিন্ন দেশে ‘স্ট্রিট হ্যারাসমেন্ট’ ক্রাইম হিসেবে বিবেচ্য, শাস্তিযোগ্য অপরাধ এটা পর্তুগাল, নিউজিল্যান্ড, ফ্রান্স, আর্জেন্টিনা, পেরু বেলজিয়ামে ইতিমধ্যেই এই আইন প্রতিষ্ঠিত, জেলের ভাত  খাবার এসব দেশের পুরুষদের জন্য সরকারের পক্ষ থেকেই দাওয়াত দেয়া আছে। শুধু স্ট্রিট হ্যারাসমেন্ট করে জেলে যাওয়াটা এসব পুরুষদের নিজেদের কষ্ট করে করতে হবে!

বাংলাদেশে কবে হবে এমন আইন?? মেয়েরা শুধু  শিকার হয়েই যাবে এমন নোংরামির? আইনের প্রয়োগ নাই বিধায় এসব নর্দমার কীটরা মহানন্দে এসব করেই যাবে দিনের পর দিন? এসব নর্দমার কীটদের জেলে কিছুদিন থাকার ব্যবস্থা সরকারের পক্ষ থেকে করা যায় না?  

অন্যান্য দেশের মত আমাদের দেশেও ‘স্ট্রিট হ্যারাসমেন্ট’কে শাস্তিযোগ্য অপরাধ ঘোষণা করা হোক।

এবং তা অবিলম্বে! আর তা ঘোষণা করেই যেন ক্ষান্ত  না দেয় সংশ্লিষ্টরা, প্রয়োগও যেন করে! আমাদের তো আবার আইন আছে, কিন্তু তার প্রয়োগ কেন যেন হয় না। যতোটা বিনীত হওয়া সম্ভব, ততোটা বিনীত হয়েই এই আবেদন সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের রেখে গেলাম।

লেখাটি ৪৪৭ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

RFL
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.