RFL

ডিভোর্সে এতো ভয় কেন মেয়ে!

0

শান্তা মারিয়া: গল্পটি এতোই পুরোনো আর গতানুগতিক যে কোনো তৃতীয় শ্রেণীর লেখকও এমন গঁৎবাঁধা কাহিনী লিখতে লজ্জা পাবে। কিন্তু লজ্জা পেলে কী হবে, জীবনের গল্প তো থেমে থাকে না। একই চক্রে ঘুরে ঘুরে চলে। সংক্ষেপে বলি, আপনারাও একটু ধৈর্য্য ধরে শুনুন। আমাকে ফোন দিয়ে যিনি ঘটনা খুলে বললেন, তিনি একজন প্রতিষ্ঠিত সাংবাদিক। তারই নিকটাত্মীয়ার সমস্যা।

মেয়েটির বয়স এখন ত্রিশের ঘরে। বিয়ে হয়েছে চার বছর আগে। মেয়েটি ভালো চাকরি করেন। দেখতেও খুব সুন্দর। স্বামী কাজ করেন একটি বেসরকারি কর্পোরেট হাউজে। লাখ দেড়েক টাকা বেতন। বাড়িতে বৃদ্ধ অসুস্থ শ্বশুর এবং প্রৌঢ় শাশুড়ি। একমাত্র দেবর বিদেশে। আপাতদৃষ্টিতে সুখের কমতি হওয়ার কথা নয়। কিন্তু কমতি হয়েছে। গুরুতরভাবেই হয়েছে। তাদের সমস্যা হলো, স্বামী এবং তার মা মিলে বউটিকে পদে পদে নাজেহাল করছে।

ভীষ্মের ছিল শরশয্যা। আর এই মেয়েটি বিদ্ধ হচ্ছে বাক্যবাণে। কেমন সেই বাক্যবাণ? শুনুন, শুনলে আপনারও আমার মতোই পিত্তি জ্বলে যাবে। মেয়েটি যখন সারাদিন অফিসে খেটে সন্ধ্যায় বাড়ি ফেরে তখন তার উপর নাশতা বানানোর হুকুম জারি করেন শাশুড়ি। ছেলের বউ নিজে হাতে চা-নাশতা না বানালে নাকি তার ভালো লাগে না। তারপর রাতের রান্নাও করতে হয়। গৃহকর্মী আছে। কিন্তু ‘বুয়ার হাতের রান্না’ ছেলে এবং তার মা মুখে দিতে পারেন না। তাই বাধ্য হযে ঘরের বউকেই বুয়ার ভূমিকায় খাটতে হয়। রাতের খাবার শেষে সবাই যখন ঘুমাতে যায় তখন শ্বশুর-শাশুড়ির ঘরে গিয়ে তাদের মশারি টাঙাতে হয় বউকেই। সকালেও অফিসে যাবার আগে মেয়েটিকেই নাশতা বানাতে হয়।

এরপরও শাশুড়ির মুখে শুনতে হয় ‘চাকরি নিয়ে পড়ে থাকে বলে আমাদের সেবা-যত্ন পাওয়া হয় না।’ প্রায়ই স্বামী ও তার মা আবদার করেন চাকরি ছাড়তে। তাহলে ‘সংসার’ দেখার কাজটি নাকি যথাযথভাবে হবে। কয়েক মাস আগে মেয়েটির মিসক্যারেজ হয়েছে। মা এবং ছেলের অভিযোগ হলো, বউয়ের ফ্যামিলিতে নিশ্চয়ই কোনো দোষ আছে নইলে এমন হবে কেন। স্বামীর নাকি কোনো রোগ বালাই নেই, তাহলে স্ত্রীর নিশ্চয়ই আছে। বিয়ের সময় মেয়েটির বাপের বাড়ি থেকে যেসব ফার্নিচার দেওয়া হয়েছে সেগুলো নাকি রদ্দি মার্কা। এগুলো ফেলে দেওয়া দরকার। জাপান থেকে দেবর যেসব চকোলেট পাঠায় শাশুড়ি সেগুলো সব ফ্রিজে গুনে গুনে রাখে, যাতে বউ কোনটা খেয়ে না ফেলে। ছেলে তার বেতনের পুরো টাকাটাই মায়ের হাতে তুলে দেয়।

ছবিটা প্রীমা নাজিয়া আন্দালিবের আঁকা

শাশুড়ি বলেছে, ‘তুমি তো সংসারে কোনো টাকা দাও না. তাহলে চাকরি করে কী লাভ?’ মেয়েটি যখন টাকা দিতে চেয়েছে, তখন জবাব শুনেছে, ‘তোমার টাকাও আমার দরকার নাই, চাকরিরও দরকার নাই’। আবার বলেছে, ‘পুরুষ মানুষের মন পেতে হলে একটু রং-ঢং অভিনয়, সেবাযত্ন লাগে। তুমি তো সেসব কিছুই পারো না’। স্বামীও যখন-তখন বউকে দূরছাই করে।

এই পর্যন্ত ঘটনা শুনে আমি বললাম আপনার আত্মীয়াকে বলুন, এখুনি ওই লোককে তালাক দিতে। তখন শুরু হলো সেই পুরানো অজুহাত। লোকে কী বলবে? ডিভোর্স হলে একটা ‘স্পট’ পড়ে যাবে। মেয়েটা ঘর বাঁচাতে চায়। আইনের আশ্রয় নিতে চায় না। ইত্যাদি ইত্যাদি। বললাম এই চিন্তাগুলো যতদিন করবে, ততোদিন নির্যাতন বন্ধ হবে না।

শুরু হলো শাশুড়ির বদনাম। তাকে যতোই বুঝাই যে, শাশুড়ি তো এখানে ফ্যাক্টর নয়, আসল দোষী তো লোকটি। যে কীনা মায়ের বিরুদ্ধে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে বউকে। পুরুষতন্ত্রের সেই পুরানো চাল চেলেছে। এক নারীর বিরুদ্ধে আরেক নারী। বউ-শাশুড়ি, ননদ-ভাবী, জা বনাম জা। ‘মেয়েরাই মেয়েদের শত্রু’ মার্কা ফরমুলা। মা পাগল হয়েছেন ছেলের উপর নিয়ন্ত্রণ হারাবার ভয়ে। কারণ তার এক ছেলে তো মুঠো ফসকে গেছে, অন্য ছেলেও পাছে হাতের বাইরে চলে যায়-এটাই তার ভয়। ছেলেটি যদি মাকে আশ্বস্ত করে স্ত্রীর প্রতি সহানুভূতি প্রকাশ করতো, তাহলে তো এত গণ্ডগোল হতো না। মা এবং ছেলে দুজনেই চরমভাবে পুরুষতান্ত্রিক মানসিকতার। সমস্যার মূল সেখানেই। আর এই ধরনের মানুষের সঙ্গে কোনো আধুনিক সচেতন আত্মমর্যাদাজ্ঞান সম্পন্ন মানুষের বসবাস করা সম্ভব নয়। তাই সেপারেশন এবং তারপরও সমাধান না হলে ডিভোর্সই পথ।

বুঝতে পারি না ডিভোর্সে এতো দ্বিধা ও ভয় কেন? সমাজের যে ভয় আমরা করি, সেই সমাজের অর্ধেক অংশ কী আমরা মানে নারীরা নই? আমি যদি একজন মানুষকে ডিভোর্সড বা ডিভোর্সড নয়, একই দৃষ্টিতে দেখি, আপনিও যদি দেখেন, তাহলে ভয়টা কোথায়? আর পাছে লোকে কিছু বলে সেটা কি খুবই জরুরি? আমি যদি অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী হই তাহলে কে কী বললো তাতে আমার কী আসে যায়?

শান্তা মারিয়া, লেখক ও সাংবাদিক

আমাদের সমাজে নারীরা অনেক বেশি দ্বিধা-দ্বন্দ্বে ভোগেন। আর ‘ভালো মেয়ে’র সার্টিফিকেট পেতেও তাদের তুমুল আগ্রহ। সেই আগ্রহ এতই প্রবল যে, তিলে তিলে জীবনের পরাজয়, সম্মানের ক্ষয় আর মানসিক মৃত্যু মেনে নিয়েও ঘর নামক একটা কারাগারে পড়ে থাকার আশা আমরা ত্যাগ করতে পারি না। আমরা ছাড়তে পারি না সেই মোহ। ত্যাগ করার সাহসটা জোগায় না মনে। তাই তো একই বৃত্তে, একই পুরনো রেকর্ড হয়ে বাজতে থাকি, বাজাতে থাকি।

মেয়েটিকে এবং তার মতো অন্যদেরও বলতে চাই, ওগো মেয়ে, ‘ভালো মেয়ে’, ‘ভালো বউ’ হতে গিয়ে জীবনটাই যে বরবাদ করে দিচ্ছো। ‘ভালো’ হওয়ার মোহটা ছাড়ো। বাঁচো। নিজের মতো করে বাঁচো। মানুষের মতো করে বাঁচো। কোথায় কোন ‘স্পট’ পড়ল তা নিয়ে ভেবো না। সাহসের ডিটারজেন্ট দিয়ে সব স্পট দূর করে ফেল।

তোমার বিশ্বটা ওই লোকের রান্না ঘর আর নাস্তার জগত থেকে অনেক বড়।‘ঘর’ নামক যে খাঁচাটা ছাড়তে তোমার এতো ভয়, সেটা তো তোমার নয় গো। সেটা ওই ব্যক্তির রাজত্ব আর তোমার জেলখানা। ওটা আদতে ‘তোমার ঘর’ই নয়।  ওই খাঁচাটা ছেড়ে বের হও, দেখবে আকাশটা অনেক বড়।

লেখাটি ২,৫০৫ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

RFL
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.