নারীবাদ ও “পুরুষ”

0

নাস্তিকের ধর্মকথা

এক

খুনি, ধর্ষক, অপরাধীদের জাত-পাত, জাতি- বর্ণ-গোত্র, ধর্ম, লিঙ্গ প্রভৃতি পরিচয় তুলে না ধরে তাদেরকে খুনি, ধর্ষক, অপরাধী বলাটাই সঠিক এবং উচিৎ কাজ। হ্যাঁ, আমি একমত – স্বাভাবিক অবস্থায় এটাই একটা নৈতিক অবস্থান। কোন ব্যক্তিবিশেষের অপরাধের জন্যে- তার জাত-পাত নিয়ে প্রশ্ন তোলা একটি রেসিস্ট বা বর্ণবাদী আচরণ বৈকি। কিন্তু মাথায় রাখা উচিৎ- এটা বেদবাক্যের মতো কোনো নীতিকথা না। কোন নির্দিষ্ট জাত- বর্ণের বা লিঙ্গের মানুষ যদি আরেকটি নির্দিষ্ট জাত- বর্ণের- ধর্মের বা লিঙ্গের মানুষের উপরে ধারাবাহিক অপরাধ সংঘটিত করেই যায়- তখন সেই অপরাধের পেছনে জাত- বর্ণ – ধর্মের বা লিঙ্গের দায়কে অস্বীকার করা বা আড়াল করা প্রকারান্তরে অপরাধের মাত্রাকে লঘু করারই নামান্তর। যেমন- এক চোর ধরা পড়লো। দেখা গেল- সে হিন্দু ধর্মাবলম্বী। এখন চোরটিকে যারা ধরেছে- তারা মুসলিম- ফলে, গালি দিয়ে বসলো যে, শালার সব হিন্দুর বাচ্চাই (মালাউনের বাচ্চাই) চোর। এইটারে বলি রেসিজম।

উল্টাটা হইলেও সত্য, মানে কোন মুসলিম ধর্মাবলম্বী চোরকে হিন্দু পাড়ায় ধরা হইলে- তারা যদি সব মুসলিমকে চোরের বাচ্চা কয়- সেইটাও একরকম রেসিজম। কিন্তু দিনের পর দিন যদি হিন্দু ও অন্যান্য ধর্মের লোকজন মুসলমান লোকদের হাতে নিগৃহীত হতে থাকে- কিংবা পাহাড়ে আদিবাসীরা নির্দিষ্ট বাঙালি জাতির মানুষদের হাতে নিগৃহীত হতে থাকে- তখন, এই অপরাধের মাত্রা, এই অপরাধকে সঠিকভাবে চিহ্নিত করতে- যথাক্রমে ধর্মীয় ও জাতিগত বিষয়টিকে আমলে নিতে হয়।

আজ দুনিয়া জুড়ে- জঙ্গীবাদের ধরন-ধারণ বুঝতে ও বুঝাতে ‘ইসলামী জঙ্গী’ শব্দবন্ধই ব্যবহার করতে হচ্ছে বৈকি … উদাহরণ রেখে মূল প্রসঙ্গে আসি। ধর্ষণ ও ধর্ষক। ধর্ষণ ও ধর্ষকাম- এর প্রধান ভুক্তভোগী নারী, এবং এই অপরাধের প্রধান হোতা পুরুষ। এটাই যখন সবসময়ের বা অধিকাংশ সময়ের সাধারণ ফেনোমেনা- তখন, এই ধরণের অপরাধের বিবরণে লৈঙ্গিক প্রকরণ খুব জরুরি ও দরকারি তথ্য, অর্থাৎ- অপরাধী ও ভিকটিমের লিঙ্গ পরিচয় উল্লেখ আবশ্যক- কেননা এই লৈঙ্গিক পরিচয় অপরাধ সংগঠনের পেছনে ভূমিকা রাখছে। ধর্ষণ বলে পরিচিত ফেনোমেনা বা আইনগত সংজ্ঞায় যাকে ধর্ষণ বলা হয়- কেবল সেগুলোকে না নিয়ে আরেকটু বড় রেঞ্জে দেখলে- নানা পর্যায়ের এবিউজকে গণনায় নিলে- আরো বিশাল অংশের পুরুষরা অপরাধীর কাতারে চলে আসে এবং তার চাইতেও বড় অংশের নারী (প্রায় প্রতিটা নারীই জীবনের নানা পর্যায়ে যৌন নিগৃহের শিকার)- ভিকটিমের কাতারে আসে।

ফলে- সমস্যার মূলে ঢুকতে চাইলে- এই লৈঙ্গিক পরিচয়কে বাদ দিয়ে হবে না। জঙ্গিরা মুসলিম না, ওদের ইসলাম সহীহ ইসলাম না, বা জঙ্গিদের কোন ধর্ম নাই – এর আদলে ধর্ষকরা পুরুষ না, তাদের লিঙ্গ নাই, তারা পুরুষ নামের কলংক এইসব বললে সমস্যাকে কেবল পাশ কাটানোই হবে।

দুই

পুরুষকে জুতা পেটাতে চাওয়া বা পুরুষের শিশ্ন কাটতে চাওয়াকে আপনার দেখতে হবে প্রতিক্রিয়া হিসাবে। সমাজের নানা স্তরের পরিচিত – অপরিচিত পুরুষের হাতে নানা রকম নিগৃহের শিকার- নারীদের কেউ কেউ যদি বিক্ষুব্ধ হয়ে পুরুষকে পেটাতে চায়- কিংবা প্রতিনিয়ত ধর্ষণের ভয়ে থাকা (হ্যাঁ- আমাদের সমাজের নারীদের বড় ভয় ধর্ষণ- সতীত্ব(!)হানি ইত্যাদি, এই ভয়েই সে তার স্বাভাবিক চলাচল করতে পারে না, রাত বিরাত, নির্জন পথ, একাকী পথ এসব তাকে পরিহার করতে হয় কেন?)- তথা পুরুষের শিশ্নকে ভয় পাওয়া- নারীদের কেউ কেউ যদি- প্রতিদিনকার প্রতিকারহীন ধর্ষণের খবর সহ্য করতে না পেরে পুরুষের শিশ্ন কাটতেই চায়- বা এই রকম অসুস্থ পরিবেশে পুরুষদেরকেই উল্টো শিশ্নের জন্যে গর্ব করতে দেখে- ঘৃণা ছুড়ে দেয় … আপনাকে বুঝতে হবে, এই প্রতিক্রিয়া, এই পাল্টা ঘৃণাটুকু অসুস্থতা নয়, বরং তা পুরুষদের তথা পুরুষতন্ত্রের তৈরি প্রচন্ড অসুস্থ ও দমবন্ধ পরিবেশে একটু প্রতিবাদ, প্রতিক্রিয়ায় দম ফেলার চেস্টা করা … এতে যদি, আপনার ‘পুরুষ’ অহমে লাগে বা আপনার পুরুষানুভূতি তথা পৌরুষ আহত হয়- তাইলে বুঝতে হবে- আপনার মধ্যে ‘পুরুষ’ জেকে বসে আছে, মানুষের বাচ্চার চাষ হয় নাই এখনো।

অদ্ভুত এক উদাহরণসমেত সমালোচনা দেখলাম: “সমকামীদের পক্ষে যুক্তি করলে মৌলবাদীরা যেভাবে আপনাকে সমকামী বলেছে, একইভাবে নারীবাদীদের সমালোচনা করলে তারা আপনাকে পুরুষ তথা পুরুষতান্ত্রিক ওরফে ধর্ষক বলেছে- ফলে এই নারীবাদীরাও মৌলবাদী”! আরেক নির্যাতিত শ্রেণী- সমকামীদের অপ্রাসঙ্গিকভাবে টেনে আনা হলো এখানে।

সমকামীদের পক্ষাবলম্বনকারীকে সমকামী বলা আর নারীবাদীদের সমালোচনাকারীকে পুরুষতান্ত্রিক বলা এক নয়। কেননা আপনি- এইক্ষেত্রে সমকামীদের পক্ষে অবস্থান নিচ্ছেন না, নিচ্ছেন- সমকামীদের যারা নিগৃহীত করে তাদের (কেননা পুরুষরা নির্যাতকের ভূমিকায়)। উদাহরণ দেই, বুঝবেন। জঙ্গীরা নাস্তিকদের চাপাতি দিয়ে কোপাচ্ছে। একজন ব্যক্তি নিজে নাস্তিক না হয়েও নাস্তিক কোপানোর বিরুদ্ধে অবস্থান নিলে- কেউ যদি তাকে নাস্তিক আখ্যা দেয়- সেইটারে আমরা মৌলবাদী কই। কিন্তু, একজন জঙ্গী না হয়েও যদি নাস্তিক কোপানোর পক্ষে যুক্তি দেয়- তাকে কি উল্টো আমরা জঙ্গী বলবো না? ফলে- ব্যাপারটা হচ্ছে, আপনি নির্যাতিত না নির্যাতক- কোন অংশের হয়ে কথা বলছেন- সেইটা বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

তিন

ধুমপান- স্বাস্থ্যের জন্যে ক্ষতিকর- নারীবাদীদেরকে এই জ্ঞান দেয়ার প্রয়োজন হচ্ছে কেন? এই ক্ষতির জ্ঞানটা আপনি পুরুষ ধুমপায়ীদের কানে গিয়ে হাজারবার করে বলছেন না কেন? এই ক্ষতিকর জিনিস যদি একজন পূর্ণবয়স্ক মানুষ জেনে বুঝে নিজে পান করে- আপনার তাতে কি সমস্যা? পুরুষ খায় বলে নারীকে ধুমপান করতে হবে, এমনটা কোন নারীবাদী বলেছে আপনাকে? একজন পুরুষ ধুমপান করলে- কারোর কোন আপত্তি নাই- নারী করলে এত আপত্তি কিসের- এই প্রশ্নটা ভ্যালিড কি না- সেইটা আগে বলেন? ভালো খারাপ অস্বাস্থ্যকর- এইসব বিচার তো সেকেন্ডারি। খারাপ কাজ করার অধিকারই বা কেবল পুরুষদের কেন হবে?

চার

রাস্তার ধারে মূত্রত্যাগ অসভ্য কাজ বলেছেন, ভালো লাগলো। এই অসভ্য কাজটি আমাদের দেশে কেবলমাত্র পুরুষরাই করে। কোন নারী বা আপনার কথিত নারীবাদীকেও এই অসভ্য কাজ করতে দেখেছেন কি? অথচ, অসভ্য পুরুষদের নিয়া একটা স্ট্যাটাস দিয়েছেন কি এই বিষয়ে? যত হম্বিতম্বি- নারীবাদীদের নিয়া। কেবল- পুরুষদের এই কামের কথা লেখছে বলেই বা নিজেরা করবে বলে হুমকি দিছে বলেই – এইসব নারীবাদীদের বিরুদ্ধে গর্জে উঠলেন? কি আজব আপনার বিচারধারা। রাস্তার পাশে মূত্রত্যাগের প্রসঙ্গটি আপনাদের কাছে ইচ্ছাপোষণ মনে হইতে পারে, আসলে ইচ্ছাপোষণ বা প্রতিযোগিতার জায়গা থেকেই কি এসব বলা হয়? নারী ও পুরুষের তুলনামূলক সুবিধার জায়গা তুলে ধরতেই কি এসব বলা হয় না? সর্বত্র পাবলিক টয়লেট থাকলে খুব ভালো, কিন্তু চিন্তা করে দেখেন তো- যেখানে এরকম পাবলিক টয়লেট নেই- সেরকম জায়গায় প্রাকৃতিক ডাকের প্রচন্ড চাপের হাত থেকে মুক্ত হওয়ার ক্ষেত্রে পুরুষদের কি কোন রকম ভয়ে তটস্থ থাকতে হয়?

পাঁচ

নারী-পুরুষের প্রতিযোগিতা হচ্ছে না মানে? আলবৎ হচ্ছে। এবং সব জায়গায় নারীকে হারিয়ে দেয়া, পিছিয়ে ফেলা, ল্যাং মেরে ফেলে দেয়ার আয়োজন সম্পন্ন। এই যখন অবস্থা- প্রতিটা ক্ষেত্রেই নারীর তুলনায় পুরুষকে দেয়া অধিক সুবিধাদির কথা আসবেই। তুলনামূলক বিচার হবেই। তুমি নারী, তাই মজুরি কম। তুমি নারী তাই তোমার প্রমোশন এতটুকু লেভেল পর্যন্ত। তুমি নারী, তাই তোমার বাইরে যাওয়ার দরকার নাই। মাঠে যাওয়ার দরকার নাই। খেলার দরকার নাই। পড়ার দরকার নাই। নিজের সিদ্ধান্ত নিজের নেয়ার দরকার নাই। বেশি খাওয়ার দরকার নাই। মাছের মাথা খাওয়ার দরকার নাই। বিড়ি খাওয়ার দরকার নাই। জিন্স পরার দরকার নাই। টি-শার্ট পরার দরকার নাই। রাস্তার ধারে মূত্রত্যাগ করার দরকার নাই। রাতে বাসার বাইরে থাকার দরকার নাই। একা একা ট্যুরে যাওয়ার দরকার নাই … পুরুষ হইলে- এগুলার কোনটাতেই কোন রা নাই, পুরুষের জন্যে সব অবারিত … ফলে- তুলনামূলক আলাপ তো আসবেই।

এই তুলনামূলক আলাপ প্রতিযোগিতার জন্যে না- প্রতিযোগিতায় ল্যাং মেরে ফেলে দেয়া বন্ধের জন্যে। যেইটা খারাপ, অসভ্য, নোংরা, ইতরামি কাম- সেগুলা খালি নারীদের শুনাইতে আসেন কেন? খারাপ তো সবার জন্যেই খারাপ। সমান খারাপ হওয়ার কথা নয় কি? দুনিয়া থেকে- দেশ- সমাজ থেকে ঐ খারাপ আগে তুলে দেন – সেইটা না করে, সেই খারাপ নিয়া নারীদের আলাদা করে বলার কিছু নাই। এই আলাদা করে বলাটা যতদিন থাকবে- খারাপকে দেখার ক্ষেত্রেও নারীতে-পুরুষে বৈষম্যের বিরুদ্ধে নারীবাদীদেরও ততদিন বলতে হবে বৈকি …

ছয়

লড়াইটা মোটেও কু-প্রথার বিরুদ্ধে না। মূত্রত্যাগ বা বিড়িফোকা এইরকমের অসভ্য, অস্বাস্থ্যকর – নোংরা, ইতর প্রথা নিয়া নারীবাদীদের কোন হেডেক নাই। লড়াই হচ্ছে পুরুষতান্ত্রিকতার বিরুদ্ধে। পুরুষতান্ত্রিকতা কোন কু-প্রথা বা নিদেন প্রথা-টথাও না। এইটা হলো ব্যবস্থা, সিস্টেম। লড়াইটা হচ্ছে সিস্টেম ভাঙার, সিস্টেম পাল্টাবার। এবং সেইটা মোটেও নারী ও পুরুষের মিলিত লড়াইও না। সেইটা মূলত নারীর, এবং কিছু মানুষ সহযোগী হিসেবে পাশে থাকবে হয়তো।

সাত

বাঙালি- মুসলিম – পুরুষ এইসব পরিচয় আপনাকে গর্বিত করে, নাকি লজ্জিত করে, তা দ্বারাই প্রকৃতপক্ষে নির্ধারিত হতে পারে- পাহাড়ে আদিবাসীদের উপর নিপীড়নে, দেশে ও দুনিয়াজুড়ে ইসলামী জঙ্গীবাদের উত্থানে, নারীদের উপর পুরুষতান্ত্রিক আধিপত্যে- আপনার অবস্থান কি হবে, ভূমিকা কি হবে! ফিলিস্তিনে ইজরাইলি আগ্রাসনের বিরুদ্ধে তীব্র অবস্থান নেয়া ইজরাইলি ইহুদি কবি সাহিত্যিক একটিভিস্টদের দেখে আপনি তাদের জায়নবাদীদের থেকে আলাদা করতে পারবেন। তারা ইজরাইলি হয়েও ইজরাইলের সমালোচনা করে, ইহুদী হয়েও জায়নিস্টদের সমালোচনা করে এবং এভাবেই তারা ঐসব পরিচয়ের ঊর্ধ্বে উঠে মানুষের কাতারে এসে দাঁড়ায়।

এটাই নিয়ম … ধর্মটা সহজে ছুঁড়ে ফেলে দেয়া যায়- কিন্তু, জাতি পরিচয়, বর্ণ, লিঙ্গ- এসব তো পালটানো যায় না … ফলে- স্বজাতি – স্ববর্ণ- স্বলিঙ্গ যদি নিপীড়ক- নির্যাতকের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়, তবে- নির্যাতক- নিপীড়কের বিরুদ্ধে ঘৃণা-ক্ষোভ এসব দেখে জাতি-গোত্র-বর্ণ-লিঙ্গের অহম যদি আহত হয়- তাইলে নিশ্চিত নির্যাতকের ঘরে গিয়ে খাড়াইবেন…সেখান থেকে নিজেরে রক্ষা করতে চাইলে- ধর্মের মত জাতি-লিঙ্গ-বর্ণ প্রভৃতি পরিচয় যেহেতু ছুঁড়ে ফেলতে পারবেন না, সেহেতু স্ব-শ্রেণীর বিরুদ্ধে শক্তপোক্ত অবস্থান নিন … এর কোন বিকল্প নাই।

লেখাটি 0 বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

RFL
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.