সূর্যাস্তের গল্প

0

গিয়াস উদ্দিন: দুপুরের সিয়েস্তা পেরিয়ে আমাদের জীবন যখন প্রৌঢ়ত্বের দিকে এগোয় তখন তাকে ভীষণ ভারী ঠেকে। তখন আমরা কী করি? আমরা আমাদের সন্তানদের আঁকড়ে ধরি। আগেও কি আঁকড়ে ছিলাম না? ছিলাম তো। আজীবন ছিলাম। কিন্তু তখন আঁকড়ে ছিলাম তাকে তৈরি করার জন্য, আর এখন— আমার নিজের একাকিত্ব কাটানোর জন্য, আমার দেখভালের জন্য।

খুব নির্মমভাবে বললে, আমার ওযুধের বিল মেটানো, আমায় ডাক্তারের কাছে নিয়ে যাওয়া, আমায় সঙ্গ দেওয়া, আমার নানা বিরক্তির বিবরণ শোনা— এ সবকিছুর জন্য তাকে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ধরি। মুক্তি পাওয়ার জন্য আমার সন্তানই যে ছটফট করছে, সে খেয়াল রাখি না। ফল কী হয়? সে সুযোগ পেলে সরে যেতে চায়। আমরাও দুঃখ পাই, যন্ত্রণা ভোগ করি মনে মনে।

এমনটা কিন্তু হয় না, যদি আমরা নিজেরাই যথাসময় নিজেদের নিয়ে একটু সচেতন ভাবে ভাবি, নিজেদের বুড়ো বয়সের কথা চিন্তা করি। কী করতে পারি আমরা? যদি বলি, নিজের বৃদ্ধাশ্রম বেছে নিয়ে সেখানে গিয়ে বসতি করতে পারি? না, সকলের কথা বলছি না নিশ্চয়ই। সকলের পক্ষে বৃদ্ধাশ্রমের ব্যবস্থা করা সম্ভবই নয়, অধিকাংশ মানুষেরই সেই সামর্থ্য নেই। আবার খুব সম্পন্ন যাঁরা, তাঁদেরও সাধারণত এই ভাবনার প্রয়োজন হয় না।

কিন্তু এই দুইয়ের মাঝখানে আছেন বহু মানুষ, যাঁদের অনেকে নিঃসঙ্গ বা মানসিক যন্ত্রণাময় জীবন কাটানোর বদলে এই পথটা নেওয়ার কথা ভেবে দেখতেই পারেন।
অনেকেই হয়তো বলবেন, তার মানে কি আমাদের সন্তানরা আমাদের ভালবাসে না? দায়িত্ব ঘাড় থেকে ঝেড়ে ফেলতে চায়? তা হলে কী শিক্ষা দিতে পারলাম তাকে? আমার নিজের জীবনটা তো পুরোটাই সন্তানের ভবিষ্যতের কথা ভেবে কাটিয়েছি। তার যাতে কোনও রকম অসুবিধে না হয়, সে যাতে সব উৎকৃষ্ট জিনিস হাতের মুঠোয় পায়, তার জন্য প্রাণপাত করেছি। তা হলে এই বয়সে তার কাছ থেকে কিছু আশা করা অন্যায়?

এর উত্তরে আমি একটা পাল্টা প্রশ্ন করব। আপনি যখন সন্তানের জন্ম দিয়েছিলেন, তখন কি তার কাছ থেকে ভবিষ্যতে কতটা পাবেন, সেই আশায় জন্ম দিয়েছিলেন? নিশ্চয়ই না। তাকে ভালবাসবেন, মানুষের মতো মানুষ করে তুলবেন বলেই তো জন্ম দিয়েছিলেন। পিতৃত্ব-মাতৃত্বের সুখ ও গৌরব পাবেন বলেই জন্ম দিয়েছিলেন। তা হলে, সে বড় হতেই তাকে বিনিয়োগ হিসেবে ভাবছেন কেন? কেন ভাবছেন আপনার পড়ন্ত বেলার সব ভার, দায়দায়িত্ব বইবে সে? তার যৌবন? সে আপনার সন্তান হতে পারে, কিন্তু সে তো এক জন স্বতন্ত্র ব্যক্তি। যার নিজস্ব, মতামত, ভাবনা, পছন্দ-অপছন্দ রয়েছে।

তাকে আপনি জন্ম দিয়েছেন বলে তো আর আপনার তার ওপর জন্মগত অধিকার বর্তায় না। যদি আপনার সন্তানের ওপর কারও অধিকার থাকে, তা এই সমাজের। আপনি সমাজকে এক জন ভাল মানুষ দেবেন কি না সেটা আপনার সন্তানকে গড়ে তোলার ওপর নির্ভর করবে। তাকে সমাজের উপযোগী করে তুলতে হবে, আপনার নয়।
প্রশ্ন উঠবে, মা-বাবা কি সমাজের বাইরে? তাঁদের প্রতি সন্তানের কর্তব্য নেই? মানবিকতার দিক থেকে, নিশ্চয়ই আছে। কিন্তু সেই দায়িত্বকে তার ওপর একটা বোঝার মতো চাপিয়ে দেওয়া ঠিক নয়।

আর তাই সময় থাকতে নিজের জীবনের দিকেও নজর দেওয়া প্রয়োজন। আপনি সন্তানকে নিশ্চয়ই সবটা ভাল দিয়ে বড় করার চেষ্টা করবেন, কিন্তু নিজেকে নিংড়ে নয়। যেমন ধরুন, আমরা সব সময় বলি, ‘এই বাড়িটা তো তোরই। বড় হলে তুইই পাবি।’ কেন? কেন আপনি আপনার বাড়ি ব্যবহার করে নিজের শেষ জীবনটার দায়িত্ব নিতে পারবেন না? আর সন্তানও এই আশায় বড় হয়ে গেল যে বাড়িটা আমার, আর তাই আমায় আর কিছু করতে হবে না— কেন? আপনার সন্তানকে তার দায়িত্ব বুঝতে দিন।

এই দায়িত্ব দিতে বা নিতে শেখার শিক্ষাটা আমাদের দেশে নেই। তাই নিজের জীবনের সবটা ঢেলে দিয়ে আমরা সম্তানকে মানুষ করি, এই আশায় যে, সে আমায় দেখবে। কিন্তু যুগ বদলেছে, সন্তানেরও একটা জীবন রয়েছে, যে জীবনটা যুগের চাহিদা অনুযায়ী তাকে কাটাতে হবে। আমার-আপনার সময়ের মতো করে নয়। আমাদের সময় সমাজ আলাদা ছিল, এখনকার সমাজ আলাদা। ফলে একটা সময় স্বপ্নভঙ্গ, মোহভঙ্গ, আশাভঙ্গের যে আঘাত আমাদের কাছে ফিরে আসে, তা সত্যিই বড় বেদনাদায়ক।

আর তাই, নিজের জীবনকে মূল্য দিতে হবে। আপনি যখন কেবল সন্তানের জন্য বাঁচছিলেন, তখন উচিত ছিল আপনার নিজের জন্যও বাঁচা। তা হলে আপনার জীবনের প্রাইম টাইমটা কেবল সন্তানের জন্য ভেবে ভেবে কেটে যেত না। আপনার সন্তান আপনার কাছে নিশ্চয়ই সবার আগে, কিন্তু আপনিও মূল্যবান। নিজের প্রতি অন্যায় করাও কিন্তু একটা বড় অন্যায়। নিজের মনের পক্ষে এবং নিজের আত্মসম্মানের পক্ষে।

এই আত্মসম্মানটা যাতে বজায় রাখতে পারেন, এবং যাতে আপনার সাহচর্যের জন্য কিছু মানুষ আপনার চার পাশে থাকে, সেই জন্যই নিজের শেষ বয়সের জন্য একটা ব্যবস্থা খুঁজে নেওয়া উচিত। আমাদের শাস্ত্রে বানপ্রস্থের ধারণা আছে— বয়স হলে সংসারে থেকেও না থাকার জীবনচর্যা। সেটা যাপন করাই ভাল। এমন একটা জায়গায় থাকলে ক্ষতি কী, যেখানে আপনার যত্ন নেওয়া হবে, আপনি অসুস্থ হলে ডাক্তারের ব্যবস্থা হবে, বিকেল বেলা আর পাঁচ জন সমবয়স্ক বা একটু ছোট-বড় মানুষের সঙ্গে আড্ডা হবে। হতেই পারে সে আড্ডা আপনার সন্তানকে কাছে না পাওয়ার কষ্টের গল্পে ভরে থাকল, কিন্তু অন্তত আরও কয়েক জন সমব্যথী তো পাবেন যাঁরা আপনার দুঃখের ভার লাঘব করতে পারেন। আপনি আর আপনার স্বামী বা স্ত্রী একটা ফ্ল্যাটে কিংবা বাড়িতে একা একা বসে থাকলেন, অসুখ হলে দেখার নেই, ছেলে বা মেয়ে আসতে পারছে না— এমন একটা অবস্থার চেয়ে তো ঢের ভাল। আর টেকনোলজির কল্যাণে চাইলেই সন্তানের সঙ্গে কথা বলার বা তাকে দেখতে পাওয়ার ব্যবস্থা তো রয়েইছে।

সন্তান যদি বোঝে যে আপনি তার ওপর নির্ভরশীল নন, সে-ও হয়তো এক দিক থেকে স্বস্তি পাবে। তার দিকটা ভেবে দেখুন, এই রকেট-জীবনে সব দিক দেখে চলতে গেলে তারও কিন্তু নাভিশ্বাস ওঠে। কে বলতে পারে, আপনি যদি তাকে আপনার দায়িত্ব থেকে কিছুটা রেহাই দিতে পারেন, আপনার সঙ্গে তার সম্পর্ক আরও ভাল হবে, আপনার অসহায়তার কথা সে আরও ভাল বুঝতে পারবে, সে আপনার খোঁজখবর রাখবে নিয়মিত, সে-ও নিশ্চিন্ত হবে।
যে কোনও সিদ্ধান্তকে কেবল একটাই দিক থেকে না দেখে, সব দিকটা বিচার করে দেখলে ভাল। কেবল হেড দেখলেই হবে? টেলও তো আছে।

লেখাটি 0 বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

RFL
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.