RFL

হায় বঙ্গবন্ধু, তোমার সোনার বাংলায় তুমিই আজ সংখ্যালঘু

0

শাশ্বতী বিপ্লব: বঙ্গবন্ধু, প্রিয় পিতা আমার, মালাউনের (!) ছত্রাখান আসবাবের সাথে লুটায় তোমার ছবি, নাকি তুমি নিজেই? পোড়া চোখ শুধু ভিজে ওঠে, ঝাপসা চোখে দেখতে পাই না ভালো। ক্ষমা করো, হে পিতা আমার।

তুমি বা তোমার ছবি আঁকড়ে ধরেও আর বাঁচতে পারে না দিনে দিনে সংখ্যালঘু থেকে লঘুতর হয়ে যাওয়া “মালাউনেরা”। লণ্ডভণ্ড হয়ে পড়ে থাকে তাদের ঘরবাড়ি, প্লাস্টিকের চেয়ার, ভাতের হাঁড়ি, আর তার সাথে ভেঙ্গে যাওয়া ফ্রেমে তুমি। লাল টুকটুকে প্লাস্টিকের টুলটা তোমার ছবিকে নতুন ফ্রেম দেয়ার ব্যর্থ চেষ্টা করে শুধু। মালাউন মেরে মেরে সাথে মেরে ফেলি আমরা তোমাকেও। ক্ষমা করো আমাদের পিতা।

attack-14নাসিরনগরে মেয়েরা লুকিয়ে থেকেছে ঘরের চালায়, পাশের দালানে। ঠিক একাত্তুরের মতো সম্ভ্রম বাঁচাতে। আতঙ্কিত শিশুকে আগলে রাখার প্রাণপণ চেষ্টা করেছে মায়েরা। পথের উপর টুকরো টুকরো হয়ে পড়ে থেকেছে দূূর্গা, কালি, স্বরস্বতীরা। অপরাধ না বুঝেও ক্ষমা চেয়েছে নিরক্ষর রসরাজ দাস। জেলখানায় বসে আবারো বুঝে নিয়েছে, “এই দেশটা তার নয়”।

অথচ, তুমি বলেছিলে, আদর্শ রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশ গড়ে উঠবে যার কোন ধর্মীয় ভিত্তি থাকবে না। আরো বলেছিলে, রাষ্ট্রের ভিত্তি হবে গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতা। কোথায় তোমার সেই আদর্শ রাষ্ট্র, কোথায়ইবা ধর্ম নিরপেক্ষতা!! তোমার সাথে সাথে ওদেরকেও কবর দিয়েছি আমরা সেই কবে।

তোমার সোনার বাংলা ছেড়ে চলে গেছে গোবিন্দ, গুপিনাথ, বীনা, শ্যামারা। আমার ছোটবেলার খেলার সাথী, আমার মায়ের কাছে পড়তে আসতো। ওরা পোদ্দার ছিলো, সোনার কাজ করতো। ওরা বুঝতে পেরেছিলো, এই দেশ ওদের নয়। আমার মনে একরাশ প্রশ্নের জন্ম দিয়ে ওরা চলে গেছে সেই কবে। ৮১ কিংবা ৮২ সালের পর আর ওদের সাথে দেখা হয়নি আমার। দেখা পাইনি উত্তরেরও।

আরও পরে, সম্ভবতঃ ৮৬ সালের দিকে, আমার গান শেখার দাদু হঠাৎ একদিন রাতে এসেছিলো আমাদের বাসায়। হাজারীবাগে আমাদের বাসার পেছনেই হিন্দুপাড়া ছিলো। দাদু সেখানেই থাকতো একটা ছাপড়া ঘরে, একা। সে প্রাণভয়ে গ্রামে চলে গিয়েছিলো কিছুদিনের জন্য। তার মালসামান, খুব সামান্যই, রাখতে এসেছিলো আমাদের বাসায়। পুরো সংসার নিয়ে ঢাকায় থাকার সামর্থ্য ছিলো না দাদুর। গান শিখিয়ে রোজগার করে বাড়ীতে টাকা পাঠাতো সে। সেই সামান্য সম্পদটুকুও ঘরে রেখে যাওয়ার সাহস হয়নি তার।

এরপর ধীরে ধীরে তোমার বাংলাদেশ ছেড়ে চলে গেছে আরো অনেকে। কেউ ধর্ষিত হয়ে, কেউ বা ধর্ষণের ভয়ে। কেউ স্বজন হারিয়ে, কেউবা স্বজন হারানোর ভয়ে। আমরা তাদের খোঁজ রাখিনি পিতা।

আজ যখন তোমার আদর্শের দল দেশ চালায়, তখন তোমারই ছবি ধূলায় লুটায়। লজ্জায় মাটিতে মিশে যেতে চায় বুঝি। তোমার সেই ভূলুন্ঠিত ছবি চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দেয় করুণ বাস্তবতা। আমরা যা দেখেও দেখি না, শুনেও শুনি না। শুধু ফুল দিয়ে বরণ করে তোমার অনুসারি বাড়াই।

তোমার আদর্শের মন্ত্রী বলেছে, “তেমন কিছুই ঘটেনি”। আরো বলেছে, “সাংবাদিকরা বাড়াবাড়ি করছে”। সে “মালাউন” দের বাড়াবাড়ি করতে নিষেধ করেছে। সে এলাকায় অবস্থানকালে আগুনে পুড়ে ছাই হয়েছে “মালাউনের” ঘর, বসতভিটা। অবাক হইয়ো না পিতা, সে তোমারই আদর্শের রাজনীতি করে। তোমার ঝাণ্ডা বহনের ভার আজ এদেরই ওপর ন্যাস্ত।

Hindusতোমার আদর্শের সৈনিকে (!) ভরে গেছে চারদিক। মুজিব কোট আর সাদা পাঞ্জাবীতে ঠিক যেন সাদাকালো পেঙ্গুইনের দল। কাউকে আর চেনা যায়না আলাদা করে। আলো বাতাস পেয়ে সবাই আজ মহীরুহ, তাদের ছায়ার অন্ধকারে ঢাকা পড়েছে তোমার আদর্শ। তাদের তুমি খুঁজলেই পাবে সেই ভীড়ের মাঝে, হেফাজত আর আহলে সুন্নাতের সমাবেশে, লাঠি আর অস্ত্র হাতে। ধর্মান্ধতার ঠুলি পড়া বাঙ্গালী মুসলমান।

শুধু তোমাকেই খুঁজে পাই না, নাসিরনগরে, সিরাজগঞ্জে, নেত্রকোণায়, রামুতে, ফরিদপুরে, বরিশালে – কোথাও না। তোমার “অসাম্প্রদায়িক বাংলার” ছবিটার ফ্রেম ভেঙ্গে গেছে পিতা। মুখ থুবড়ে পরে আছে “মালাউনের” উঠানে। তুমি আর তোমার আদর্শই সবচেয়ে বড় সংখ্যালঘু আজ এইদেশে। আমাদের ক্ষমা করো তুমি পিতা, শেখ মুজিব।

লেখাটি ১৭,৪৫১ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

RFL
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.