RFL

হিন্দু শিক্ষার্থীটির চোখের দিকে তাকাতে লজ্জা হয়   

0

কাম্রুন নাহার রুমা: এবার দুর্গা পূজায় স্কুল বেলার দুই হিন্দু বান্ধবী আমায় ফেসবুকে ম্যাসেজ পাঠিয়েছিল দশমীতে বাড়ি যাচ্ছি কীনা জানতে। আমি কাউকেই কোন উত্তর দেইনি।

কী উত্তর দেবো! বুকের ভেতর অদ্ভুত এক বেদনা নিয়ে কেটেছে এবারের দুর্গা পূজা! দশমীর সরকারী ছুটিতেও ঘর থেকে বের হইনি। অথচ এই হিন্দু বান্ধবীদের সাথে আমার স্কুল বেলা কেটেছে প্রতিমা বানানো থেকে বিসর্জন পর্যন্ত ধুন্দুমার মাস্তি করে। আমাকে কেউ বুঝতেই দেয়নি ওটা হিন্দুদের ধর্মীয় উৎসব। আমরা একসাথে ঈদ করেছি, পূজা করেছি। লক্ষ্মী পূজায় নাড়ু-লাড্ডু নিয়ে কাড়াকাড়ি করেছি, দশমির দিন লুচি লাবড়া খেয়েছি পেট ভরে। স্কুলবেলার কথাই কেন বলছি, এইতো এক বছর আগেও আমরা বান্ধবীরা মিলে আমাদের মফঃস্বল শহরের অধিকাংশ মণ্ডপ চষে বেড়িয়েছি রাত ১০তা পর্যন্ত। ধুনুচি নাচ দেখেছি, না পারলেও তাল মিলিয়েছি গানের সুরে, ঢাকের তালে।   

10658570_10204726730786618_4753997966757513674_o

কামরুন্ নাহার রুমা

মনে পড়ে ছেলেবেলার এক দশমীর কথা। আমি তখন দ্বিতীয় শ্রেণীর ছাত্রী।  অনেক ভিড় ছিল সেদিন যেহেতু শেষদিন ছিল, সামনে যাবার উপায় নাই। আব্বা অনেক পেছনে; আমি ছোট মানুষ কিছুই দেখতে পাই না। আব্বা তখন আমাকে তাঁর কাঁধে তুলে নিলেন।

তারপর জিজ্ঞেস করলেন ‘দেখতে পাচ্ছিস’? আমি বলেছিলাম ‘হ্যাঁ আব্বা দেখতে পাচ্ছি’ । আমার দুই পা আব্বার কাঁধের দুইদিকে ঝুলিয়ে আমি সেদিন প্রাণভরে দুর্গা প্রতিমা দেখেছিলাম। অথচ সেদিন সকালেই আব্বা নিজের হাতে আমাকে ওজু করিয়ে সালওয়ার কামিজ পরিয়ে ওড়না মাথায় পরিয়ে মক্তবে নিয়ে গিয়েছিলেন আরবি পড়া শিখতে আর সেই তিনিই রাতে আমায় দুর্গা প্রতিমা দেখাতে নিয়ে গিয়েছিলেন। আমার বাবা শতভাগ সংস্কারমুক্ত মানুষ ছিলেন বলবো না, কিন্তু তিনি মানুষ ছিলেন সবার আগে। ধর্মের আগে উনি অন্তরের মর্মবাণী উপলব্ধি করেছিলেন।   

আমরা হিন্দু অধ্যুষিত এলাকাতে থাকার সুবাদে আমাদের ভাইবোনদের অধিকাংশ বন্ধু-বান্ধবই ছিল হিন্দু। আমরা যতটা না হিন্দু-মুসলিম হিসেবে, তার চেয়ে বেশি মানুষ হিসেবে বেড়ে উঠেছিলাম। পূজায় ধর্ম-বর্ণ-নির্বিশেষে দল বেঁধে ভাইয়া আপারা মণ্ডপে মণ্ডপে ঘুরতেন, দশমীতে নিমন্ত্রণে বাড়ি যেতেন আমিও যেতাম তাদের সাথে। সেই থেকে আসলে মানুষকে মানুষ ভাবার শিক্ষাটাই নিয়েছিলাম বড়দের কাছ থেকে – হিন্দু-মুসলিম ভাবার শিক্ষা নয়। ঈদে দলবেঁধে আপা ভাইয়াদের হিন্দু-মুসলিম সব বন্ধুরা আসতেন তাতে আনন্দটা দ্বিগুণই হতো।

শুধু চোখ বের করে বোরখা পরা আমার মা কোনদিন আমাদের হিন্দু বন্ধুদের সাথে মেলামেশায় বাঁধ সাধেননি। উনি মন ও মননে খুব আধুনিক ছিলেন। উনি শরীরটাকে পর্দায় ঢেকে রাখতেন ঠিকই, কিন্তু ওনার মনের চোখ ছিল সবসময় খোলা আর উদার। আমার আপার সব বান্ধবীদের সাথে আমার মায়ের ভাল সখ্যতা ছিল। মৃত্যুর আগেও আমার মা আপাদের বান্ধবীদের কথা জিজ্ঞেস করতেন। জানতে চাইতেন ‘দেবী কেমন আছে’ ‘বীথিকার অনেকদিন কোন খবর নাই’ রুমা কি দেশে আসে না‘? ইতি-রুনু আপার কথাও বলতেন প্রায়ই। শিরিন আপা, মুন্নি আপা, শম্পা আপা, তাহমিনা আপা, পূরবী আপা, ময়না আপা, নাজু আপা সবার কথা বলতেন উনি।   

এইতো সেদিন দীপাবলির পরদিন ছাত্রী নাড়ুমুড়ি নিয়ে এলো। ও ভালবেসে এনেছে, আমিও ভালবেসে নিয়েছি, খেয়েছি – উৎসবের খাবার বলে কথা। উৎসবটা পূজা না ঈদ, সেটাতো বড় কথা নয়।

atack_on_hindus

ছবিটি সংগৃহীত

এক হিন্দু সহকর্মী লুচি সবজি খাওয়ালেন সেদিন- তৃপ্তি করে খেলাম। ওটা হিন্দুদের তৈরি খেলে আমার জাত চলে যাবে যদি এই ভাবনা ভাবি তাহলে বলতে হয় “ভাইরে তোর ধর্ম এতো ঠুনকো কেন হবে যে হিন্দুর হাতের সামান্য লুচি খেলে তা ভেঙ্গে যাবে; কিসের ঈমান তোর মানুষকে মানুষ না ভেবে হিন্দু মুসলিম ভাবিস”! তুই তোর কোন কর্মের গুণে স্বর্গে বা নরকে যাবি তা যদি তুই জানতি তাহলে মানুষের পৃথিবীতে জন্ম নিয়ে ধর্মের নামে মারামারি কাটাকাটি করতি না। যে জায়নামাজে দাঁড়িয়ে একজন মুসলিম নামাজ পড়ে সেটা যে কোন হিন্দুর হাতের তৈরি না তার নিশ্চয়তা কী, বা যে দামী শাড়িটা দুর্গা প্রতিমার গায়ে ওঠে ওটা যে কোন মুসলমানের হাতে তৈরি না সে ব্যাপারেও আমরা নিশ্চিত নই। তাহলে কিসের এই মিথ্যা আস্ফালন?   

ইদানীং সংখ্যাগুরু হবার দায় মাথায় নিয়ে অনেকটা মাথা নিচু করে হাঁটি। ভেতরটা হাহাকার করে। আমি আমার বান্ধবীদের ম্যাসেজের উত্তর দিতে পারিনি এক অদ্ভুত লজ্জায়। আমি আমার হিন্দু ছাত্রটির চোখে সরাসরি চোখ রাখতে পারি না, তার দিকে তাকিয়ে পড়াতে পারিনা ; ভয়াবহ এক অপরাধবোধ কাজ করে।

আমি যে সংখ্যাগুরু! আমি যে তার নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারছি না এই দেশে। কী লজ্জা কী লজ্জা! ইতিহাস সাক্ষী অস্তিত্বের লড়াইয়ে সাধারণ মানুষ কখনোই ধর্মকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করেনি; করেছে রাজনীতিবিদরা, নয়তো বকধার্মিকরা। কিন্তু তাদের কৃতকর্মের বিষফলা এসে বরাবরই বিঁধেছে আমাদের মতো সাধারণ মানুষদের বুকে। বরং সাধারণ মানুষকে ভয় দেখিয়ে ধর্মের ঢাল হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে।   

আমি জানি আমার ছাত্রটি আমায় মানুষই ভাবে, শুধুই মুসলিম না বা আমিও তাকে হিন্দু ভাবি না। কিন্তু আমার যে ভীষণ কষ্ট হয়! আমি যে নোংরা মানুষদের নোংরা কর্মের ফল বয়ে বেড়াচ্ছি। তাই সংখ্যাগরিষ্ঠ  হওয়াতে আমার মধ্যে কোন অহংকার নয়, বরং এক অদ্ভুত লজ্জা কাজ করে, অপরাধবোধ কাজ করে, কাজ করে হীনমন্যতা।

রাজনৈতিকই স্বার্থ হাসিলের জন্য আপনারা যারা ধর্মকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করছেন তাদেরকে বলছি দয়া করে ক্ষেমা দেন – আপনাদের রাজনীতির নোংরা খেলায় আমরা যারা সাধারণ মানুষ তাদের জীবন দুর্বিষহ হয়ে উঠছে; আপনাদের ক্ষমতার লিপ্সায়, মুর্খতায়, ভণ্ডামিতে আমাদের মাথা হেঁট হয়। মানুষের রক্তগঙ্গা পেরিয়ে এই দেশে স্বাধীনতা এসেছে, কোন হিন্দু বা মুসলিমের একক রক্তগঙ্গা নয়। অসাম্প্রদায়িকতার কথা শুধু মুখে বললে হবে না, আপনাদের কাজে আপনারা তার প্রতিফলন দিন! আমি সংখ্যাগরিষ্ঠ হবার লজ্জা নিয়ে বাঁচতে চাই না, মানুষ হয়ে বাঁচতে চাই।

জ্যেষ্ঠ প্রভাষক, সাংবাদিকতা গণযোগাযোগ বিভাগ, ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি

লেখাটি ৬৪,৪০৮ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

RFL
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.