যেকোনো পোশাকে মেয়েদের দেখতে শিখুন

2

আফরিন শরিফ বিথী: আমাদের সমাজে আমরা কিছু মেয়েকে প্যান্ট, শার্ট, টি-শার্ট, ফতুয়া পরতে দেখি, যে পোশাকগুলোকে আমরা ছেলেদের পোশাক বলে জানি। যে মেয়েটা এ ধরনের পোশাক পরে সমাজ তাকে ভাল চোখে দেখে না। লোকজন চোখ বড় বড় করে তাকায়, নাক সিঁটকায়,মশকরা করে, বিভিন্ন কটুক্তির শিকার হতে হয় মেয়োটাকে।

কিন্তু এই পুরুষতান্ত্রিক সমাজ কি কখনো ভেবে দেখেছে একটা মেয়ে কেন পুরুষালি পোশাক পরে? আমি সেই কারণটাই বলতে চাচ্ছি।

FB_IMG_1472469803223যে মেয়েটা স্বাধীনচেতা দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে এই পরাধীন সমাজটাতে জন্ম নিয়েছে, সে দেখে এসেছে একটা প্যান্ট,শার্ট/টি-শার্ট পরা ছেলে যতটা স্বাধীনভাবে এ সমাজে চলাফেরা করে, লম্বা সালোয়ার-কামিজ, বিশাল আকারের ওড়না পরা একটা মেয়ে ঠিক ততটাই পরাধীনভাবে চলাফেরা করে।

ছেলেটা যখন ইচ্ছে ঘর থেকে বের হচ্ছে, যখন ইচ্ছে ঘরে ফিরছে, রাত করে বাড়ি ফিরছে, কেউ তাকে কিছু বলছে না। ছেলেটাকে পথেঘাটে যৌন হয়রানির শিকার হতে হচ্ছে না। বিপরীতে সালোয়ার-কামিজ পরা,মাথায় লম্বা চুল নিয়ে বড় হওয়া একটা মেয়ে দেখে আসছে শৃঙ্খলিত জীবনযাপন করতে। মেয়েটা বাবা-মায়ের অনুমতি ছাড়া কোথাও যেতে পারে না। এমনকি কোথাও যেতে সে অনুমতিই পায় না ইত্যাদি ইত্যাদি, যা আমরা সবাই জানি।

তো, সেই স্বাধীনচেতা মেয়েটা এসব দেখে বুঝে গেছে যে, সেও যদি ঐ মেয়েলি পোশাক পরে, তাহলে তাকেও সমাজের আট-দশটা মেয়ের মতো জীবনযাপন করতে হবে। কিন্তু সে তো সেটা চায় না! সে চায় একটা ছেলের মতই স্বাধীনভাবে চলাফেরা করতে, রাস্তার মোড়ে বন্ধুদের সাথে আড্ডা দিতে, কখনো কখনো রাত করে বাড়ি ফিরতে, সাইকেল চালাতে।

তাই মেয়েটা পছন্দ করে ছেলেদের মতো পোশাক পরতে, মাথায় ক্যাপ পরতে, ছেলেদের মতো ছোট চুল রাখতে। এই যে মেয়েটার পুরুষালি পোশাক বেছে নেয়া, এটা কিন্তু তার পরিবার ঠিক করে দেয়নি। মেয়েটার স্বাধীনচেতা দৃষ্টিভঙ্গির কারণে তার অবচেতন মনেই পুরুষালি পোশাকের প্রতি তার ভাললাগার সৃষ্টি হয়েছে। আর মেয়েলি পোশাকের প্রতি সৃষ্টি হয়েছে এক ধরনের ঘৃণা, অনীহা।

সে নিজেকে মেয়েলিভাবে উপস্থাপন করতে চায় না, মেয়েলি পোশাকে সে অস্বস্তি বোধ করে। পুরুষালি পোশাকেই সে স্বস্তি পায়, স্বাধীনতার স্বাদ পায়। আপনি কি বলবেন এটা মেয়েটার হরমোনজনিত সমস্যা? মোটেও না। যদি তাই হতো তাহলে সে একটা সময় মাতৃত্বের স্বাদ পেতে ব্যাকুল হতো না।

এখন আমি এই পুরুষতান্ত্রিক সমাজের মানুষগুলোকে বলছি- আপনারা যদি মনে করেন যে মেয়েদের দৈহিক গঠনের ভিন্নতার কারণেই মেয়েলি পোশাক পরা উচিৎ, মেয়েলি পোশাকেই একটা মেয়েকে সুন্দর দেখায়, মেয়েলি পোশাকেই একটা মেয়েকে দেখতে চান, তাহলে ছেলেমেয়ের চলাফেরার স্বাধীনতায় সমতা প্রয়োগ করুন। যদি তা না পারেন তাহলে পোশাকটাকেই বরং সমতা দিন। ছেলেমেয়ের আলাদা পোশাক থাকার কোন দরকার নেই।

যে যেই পোশাকে সুবিধাবোধ করবে, সে সেই পোশাক পরবে, সেটা মেনে নিন। বয়কাট চুল,প্যান্ট, টি-শার্ট পরা একটা মেয়েকে সাইকেল চালাতে দেখে আকাশে বকপাখি ওড়ার মত স্বাভাবিক দৃষ্টিতে দেখতে শুরু করুন।

বড় একটা ওড়না পরে,পা পর্যন্ত সালোয়ার-কামিজ পরে একটা মেয়ে নিশ্চয়ই হাফ প্যান্ট পরা একটা ছেলের সাথে দৌড় প্রতিযোগিতায় জেতা তো দূরের কথা, অংশ নিতেই পারবে না। যে মেয়েকে রিকশা/অটোর চাকায় ওড়না পেঁচিয়ে মরতে হয়, সেই মেয়ে কী করে সঠিক সময়ে স্কুল/ কলেজ/বিশ্ববিদ্যালয়ে/অফিসে পৌঁছানোর জন্য দৌড়ে বাসে উঠবে? বাসে উঠে দুই হাত দিয়ে ওড়না সামলাবে নাকি বাসের হ্যান্ডেল ধরে দাঁড়িয়ে থাকবে?

এজন্যই মেয়েদের জন্য পাবলিক বাসে সিট বরাদ্দ রাখা হয় প্রতিবন্ধী ও বৃদ্ধদের মতো! তাও কি সবাই সিট পায়! যারা না পায়, তারা কতটা কষ্ট করে ওড়না সামলাতে সামলাতে দাঁড়িয়ে থেকে গন্তব্যে পৌঁছায় কখনো কি ভেবে দেখেছেন? নাকি প্রতিটা মেয়ের জন্য একটা করে প্রাইভেট কার বরাদ্দ রেখেছেন?

যে পোশাক পরে একটা মেয়ে অনায়াসে দৌড়ে বাসে উঠতে পারে,সাইকেল চালিয়ে গন্তব্যে পৌঁছতে পারে, সেই পোশাকে কেন এত আপত্তি আপনার? নিজের চোখ ও হাত সংযত করতে না পারার কারণে?

ভাই আপনার চোখ, হাত সংযত করার দায়িত্বটা আপনার, মেয়েটার না। পথে-ঘাটে অাপনার কামনা-বাসনা জেগে উঠবে এটা কেমন কথা! নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করার এতোটুকু দৃঢ়তা নেই আপনার? কই আপনাদের দেখে পথেঘাটে একটা মেয়ের তো কোন সমস্যা হয় না। নাকি মেয়েদের যৌন চাহিদাই নাই? বরং শুনেছি তো উল্টোটা।

তাহলে ভাবুন তো, একটা মেয়ের ব্যক্তিত্ববোধ, নিয়ন্ত্রণ ক্ষমতা কত ঊর্ধ্বে! আর সেই মেয়েকে আপনি সম্মান দিতে চান না! আজব এক পুরুষতান্ত্রিক ব্যাধিতে আক্রান্ত আপনি। দ্রুত আপনার চিকিৎসা দরকার।

লেখাটি ১,৯২৬ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

RFL
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.